হরমুজ প্রণালী যেভাবে হয়ে উঠছে ইরানের ‘প্রতিরক্ষা ঢাল’

মারিয়া হাসিবা

আন্তর্জাতিক

চলমান সংঘাত ও ঝুলে থাকা ‘শান্তি চুক্তি’র মাঝে বারবার আলোচনায় থাকছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন হুমকির ঝাঁজ বরাবরই হরমুজে

2026-05-18T21:28:48+00:00
2026-05-18T21:30:03+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
হরমুজ প্রণালী যেভাবে হয়ে উঠছে ইরানের ‘প্রতিরক্ষা ঢাল’
মারিয়া হাসিবা
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬, ৯:২৮ পিএম  আপডেট: ১৮.০৫.২০২৬ ৯:৩০ পিএম
এআই জেনারেটেড ছবি।
চলমান সংঘাত ও ঝুলে থাকা ‘শান্তি চুক্তি’র মাঝে বারবার আলোচনায় থাকছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন হুমকির ঝাঁজ বরাবরই হরমুজে এসে থমকে যাচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন লেয়ারে হরমুজ প্রণালী ইরানের ‘প্রতিরক্ষা ঢাল’ হিসেবে সামনে আসছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালী এখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। 

এদিকে, যুদ্ধ সমাপ্তির প্রক্রিয়া থেমে থাকার জন্য ইরানকে দায়ী করে ফের সতর্কবার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রোববার (১৭ মে) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করা এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের (ইরান) দ্রুত নড়াচড়া করতে হবে, নয়তো তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং ঘড়ির কাঁটা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।’

একই দিন ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— সংঘাত নিরসনে ইরান সর্বশেষ যে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আরও বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ‘আপোসের অভাবই’ ‘আলোচনায় অচলাবস্থা’র জন্য দায়ী।

‘আলোচনায় অচলাবস্থায়’ থাকলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় হরমুজ। কারণ, এ প্রণালীকে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম সংকীর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ 'চোকপয়েন্ট' হিসেবে দেখা হলেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এর গুরুত্ব আরও এক ধাপ বেড়েছে। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন ইন্টারনেট কেবলকে ঘিরে নতুন এক কৌশলগত প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত সামনে আসছে, যেখানে জ্বালানির পাশাপাশি ডিজিটাল ডেটা প্রবাহও ভূরাজনৈতিক চাপের অংশ হয়ে উঠছে।

সিনএনএনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান হরমুজ অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক সাবসি কেবল নেটওয়ার্কের ওপর প্রভাব বিস্তার বা নিয়ন্ত্রণ আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছে। এই কেবলগুলো ইউরোপ, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডেটা পরিবহন করে। বৈশ্বিক ব্যাংকিং লেনদেন, স্টক মার্কেট ট্রেডিং, ক্লাউড কম্পিউটিং, বড় প্রযুক্তি কোম্পানির ডেটা সেন্টার এবং এমনকি সরকারি ও সামরিক যোগাযোগ— সবই হরমুজের ওপর নির্ভরশীল।

হরমুজ : জ্বালানি থেকে ডিজিটাল শক্তির কেন্দ্র 

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হরমুজ প্রণালী এরইমধ্যেই একটি অপরিহার্য তেল পরিবহন পথ। প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশের সমান। একই সঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যও এই করিডোরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এটি শুধু জ্বালানি পরিবহনের পথ নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তি নিরাপত্তার একটি মূল স্তম্ভ।  

এখন এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি স্তর— ডিজিটাল অর্থনীতি। সাবসি কেবলগুলো একই করিডোর দিয়ে যাওয়ায় এটি ধীরে ধীরে ‘ডুয়াল-চোকপয়েন্টে’ পরিণত হচ্ছে— যেখানে জ্বালানি এবং তথ্য প্রবাহ একসঙ্গে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।


সাবসি কেবল : আধুনিক অর্থনীতির অদৃশ্য স্নায়ুতন্ত্র

বিশ্বের ইন্টারনেট ডেটার ৯৫ শতাংশেরও বেশি সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া ফাইবার অপটিক কেবলের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। এই কেবলগুলো ছাড়া আধুনিক অর্থনীতি কার্যত অচল। এই নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে— আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সিস্টেমের রিয়েল-টাইম লেনদেন, বিশ্বব্যাপী শেয়ার বাজারের মিলিসেকেন্ড-ভিত্তিক ট্রেডিং, ক্লাউড সার্ভিস ও ডেটা স্টোরেজ, গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা, অ্যামাজনের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানির অপারেশন এবং কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা।

এই কারণে সাবসি কেবল এখন শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির ‘অদৃশ্য স্নায়ুতন্ত্র’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



‘ক্যাসকেডিং ডিজিটাল বিপর্যয়’ : ইরানের সম্ভাব্য কৌশলগত অবস্থান

বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃমহাদেশীয় সাবমেরিন কেবল হরমুজ প্রণালী দিয়ে অতিক্রম করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক হাবতুর রিসার্চ সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক মোস্তফা আহমেদ বলেন, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক কেবল অপারেটররা ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানের জলসীমা এড়িয়ে গেছে। ফলে বেশিরভাগ কেবল একটি সংকীর্ণ পথে ওমানের জলসীমার কাছাকাছি ঘনীভূত হয়ে গেছে।  

টেলিজিওগ্রাফির গবেষণা পরিচালক অ্যালান মৌলদিন বলেন, এই অঞ্চলে অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ কেবল— ফ্যালকন এবং গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল (জিবিআই) ইরানের জলসীমার কাছ দিয়ে গেছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, যদিও ইরান সরাসরি এসব কেবল ক্ষতিগ্রস্ত করার কথা বলেনি, তবে দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক মহল থেকে বারবার এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, তারা আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের ওপর চাপ প্রয়োগে নতুন কৌশল ব্যবহার করতে পারে।

গবেষক আহমেদ সতর্ক করে বলেন, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) পানির নিচে অভিযান চালানোর সক্ষমতা— যেমন ডুবুরি, ছোট সাবমেরিন এবং আন্ডারওয়াটার ড্রোন; এই কেবলগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তার মতে, এমন কোনও হামলা ঘটলে তা বহু মহাদেশজুড়ে ‘ক্যাসকেডিং ডিজিটাল বিপর্যয়’ তৈরি করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ‘পারস্য উপসাগরের দেশগুলোতে ইন্টারনেট সংযোগ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে, যা তেল ও গ্যাস রফতানি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং আর্থিক লেনদেনে বড় প্রভাব ফেলবে।’

ভারতের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন, কারণ দেশটির ইন্টারনেট ট্রাফিকের বড় অংশ এই করিডোর দিয়ে যায়। এতে ভারতের আইটি ও আউটসোর্সিং খাত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

এছাড়া এই প্রণালীকে সিঙ্গাপুর ও ইউরোপের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কেবল ল্যান্ডিং স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রধান ডিজিটাল করিডোর হিসেবে দেখা হয়। তাই কোনো বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে ইউরোপ– এশিয়া বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন ধীর হয়ে যেতে পারে এবং পূর্ব আফ্রিকার কিছু অংশে ইন্টারনেট বিভ্রাট দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

আর যদি ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো লোহিত সাগরেও একই ধরনের কৌশল গ্রহণ করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। 

হংকংভিত্তিক এইচজিসি গ্লোবাল কমিউনিকেশনসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর হামলায় একটি জাহাজ ডুবে যাওয়ার সময় সেটি সমুদ্রের তলদেশে তার নোঙর টেনে নিয়ে যায়। এর ফলে তিনটি সাবমেরিন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার কারণে ওই অঞ্চলে প্রায় ২৫ শতাংশ ইন্টারনেট ট্র্যাফিক ব্যাহত হয়েছিল। 

তবে টেলিজিওগ্রাফি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া কেবলগুলো ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী বৈশ্বিক আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের ১ শতাংশেরও কম বহন করে। অর্থাৎ বৈশ্বিক পর্যায়ে এর সরাসরি অংশ তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও আঞ্চলিকভাবে এর গুরুত্ব অনেক বেশি।

এই ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে তা কার্যত ডেটা প্রবাহের ওপর আংশিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সমান হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এটি ভবিষ্যতে ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব বনাম বৈশ্বিক ইন্টারনেট অবকাঠামো’ ধরনের নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।

যদি সাবসি কেবল অবকাঠামোতে বিঘ্ন ঘটে, তাহলে আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেন ধীর বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, বৈশ্বিক শেয়ার বাজারে ট্রেডিং ব্যাহত হতে পারে, ক্লাউড সেবায় আউটেজ দেখা দিতে পারে এবং বড় প্রযুক্তি কোম্পানির ডেটা সিস্টেম অচল হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে ‘ক্যাসকেডিং ডিজিটাল বিপর্যয়’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে একটি অঞ্চলের যেকোনো ত্রুটি দ্রুত বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়ে।

বর্তমান বাস্তবতা : পরিকল্পনা নয়, কৌশলগত ইঙ্গিত

তবে এখন পর্যন্ত এসব বিষয় কোনো আনুষ্ঠানিক নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বেশিরভাগ বিশ্লেষক এটিকে কৌশলগত বার্তা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নীতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

তবুও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ যদি এই ধরনের কৌশল বাস্তবে প্রয়োগ হয়, তাহলে এর প্রভাব একসঙ্গে একাধিক খাতে পড়তে পারে— জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা, ডিজিটাল অর্থনীতিতে অচলাবস্থা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের বিঘ্ন।

তেল বাজারে হরমুজের ভূমিকা ও ঝুঁকি

ডিজিটাল অবকাঠামোর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী এখনো বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল প্রবাহ পথ। এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। ফলে এখানে কোনও ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা সরাসরি বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলে।

এর ফলে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে, সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো এই রুটের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল হওয়ায় তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব

হরমুজে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানির দাম বাড়লে পুরো বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থা প্রভাবিত হয়।

পরিবহন খরচ ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে এবং খাদ্যপণ্যের দামে চাপ পড়ে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে, কারণ আধুনিক অর্থনীতির প্রায় সব খাতই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। 


যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পরোক্ষ প্রভাব

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হলেও বৈশ্বিক তেল বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকার কারণে হরমুজ প্রণালীর যেকোনো সংকট থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। কারণ তেল এমন একটি পণ্য, যার দাম স্থানীয়ভাবে নয় বরং আন্তর্জাতিক বাজারে নির্ধারিত হয়। ফলে পৃথিবীর যেকোনো বড় সরবরাহ বিঘ্ন— বিশেষ করে হরমুজের মতো গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্টে— সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও ঢেউ তুলতে সক্ষম। 

যখন হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা বা সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হয়, তখন বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই আশঙ্কাই অনেক সময় বাস্তব ঘাটতির আগেই বাজারে দাম বাড়িয়ে দেয়। ফলে ব্রেন্ট ক্রুড বা ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডাব্লিউটিআই) উভয় ধরনের তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়, যা সরাসরি আমদানি ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি খরচে প্রতিফলিত হয়। 

এর প্রথম এবং সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেট্রোল ও ডিজেলের দামও বেড়ে যায়, ফলে প্রতিদিনের যাতায়াত, ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি খরচ এবং পরিবহন নির্ভর জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে অধিকাংশ মানুষ গাড়ি-নির্ভর যাতায়াত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এই মূল্যবৃদ্ধি দ্রুতই জনজীবনে চাপ তৈরি করে।  

এর পাশাপাশি বড় ধরনের প্রভাব পড়ে পরিবহন ও লজিস্টিক খাতে। ট্রাকিং, এয়ারলাইন, শিপিং এবং ডেলিভারি সেবার খরচ বেড়ে গেলে তা সরাসরি পণ্যের মূল্যে প্রতিফলিত হয়। অর্থাৎ শুধু জ্বালানির দামই নয়, বাজারে পৌঁছানো প্রায় সব ধরনের পণ্য— খাদ্য, পোশাক, ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে কাঁচামাল পর্যন্ত সবকিছুর দাম ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

এই পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। কারণ উৎপাদন খরচ বাড়লে কোম্পানিগুলো সেই অতিরিক্ত ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেয়। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করাও আরও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ফেডারেল রিজার্ভের জন্য এটি একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে, কারণ একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ দুটোই একসঙ্গে সামলাতে হয়। 

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মনস্তাত্ত্বিক বাজার প্রভাব। হরমুজে অস্থিরতা দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ে, যার ফলে শেয়ারবাজার ও জ্বালানি-সম্পর্কিত কোম্পানিগুলোর স্টকে ওঠানামা দেখা দেয়। একই সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যৎ খরচ বাড়ার আশঙ্কায় আগেভাগেই বাজেট ও মূল্য নির্ধারণে পরিবর্তন আনে, যা অর্থনীতিতে একটি ‘প্রি-এম্পটিভ ইনফ্লেশন ইফেক্ট’ তৈরি করে।  

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তেল আমদানির ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল না হলেও বৈশ্বিক বাজার ব্যবস্থার কারণে হরমুজ প্রণালীর যেকোনো সংকট দেশটির অর্থনীতিতে ধাপে ধাপে বিস্তৃত প্রভাব ফেলে, যা শুরু হয় জ্বালানি বাজার থেকে, তারপর ছড়িয়ে পড়ে পরিবহন, উৎপাদন, ভোক্তা মূল্য এবং শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।

হরমুজ প্রণালীর সংকটকে বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল)। কারণ বিশ্ববাজারে জ্বালানি দামের ভিত্তি নির্ধারণ হয় এই ক্রুড অয়েলের সরবরাহ, চাহিদা এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকির ওপর। হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয়, তার বড় অংশই হলো ক্রুড অয়েল, যা পরে বিভিন্ন দেশে পরিশোধন করে পেট্রোল, ডিজেল, জেট ফুয়েলসহ নানা জ্বালানিতে রূপান্তর করা হয়।

যখন হরমুজ প্রণালীতে কোনও ধরনের উত্তেজনা বা সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হয়, তখন প্রথম প্রতিক্রিয়া দেখা যায় ক্রুড অয়েলের আন্তর্জাতিক বাজারে। সরবরাহ কমে যেতে পারে— এই আশঙ্কাতেই ব্যবসায়ীরা আগেভাগে তেল কিনতে শুরু করে, ফলে বাজারে ‘স্পেকুলেটিভ ডিমান্ড’ তৈরি হয়। এর ফলে ব্রেন্ট ক্রুড এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) উভয় ধরনের তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়, এমনকি বাস্তব ঘাটতি না থাকলেও। 

এই দাম সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে, কারণ দেশটি নিজে বড় তেল উৎপাদক হলেও তার অভ্যন্তরীণ বাজার বিশ্ববাজারের ক্রুড অয়েলের দামের সঙ্গে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রে অনেক শোধনাগার নির্দিষ্ট ধরনের ক্রুড অয়েলের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে ভারী অপরিশোধিত তেল, যা কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের রিফাইনারিগুলোর কাঁচামাল খরচও বেড়ে যায়।  

ক্রুড অয়েলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব পড়ে পেট্রোল ও ডিজেলের দামে। কারণ এই দুই জ্বালানি মূলত ক্রুড অয়েল থেকে পরিশোধিত হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ যখন গাড়িতে জ্বালানি ভরেন, তখন সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ অনুভব করেন। দৈনন্দিন যাতায়াত থেকে শুরু করে ট্রাকিং ও এয়ারলাইন খরচ— সবকিছুই ধীরে ধীরে বেড়ে যায়। 

এর পাশাপাশি ক্রুড অয়েল-নির্ভর শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। প্লাস্টিক, কেমিক্যাল, কৃষি সার, এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদনের কিছু অংশেও তেলের পরোক্ষ ব্যবহার রয়েছে। ফলে ক্রুড অয়েলের দাম বাড়লে শুধু জ্বালানি খাত নয়, পুরো শিল্প অর্থনীতিতেই চাপ তৈরি হয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ক্রুড অয়েলের দামের সঙ্গে  সরাসরি মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে সাহায্য করে। কারণ জ্বালানি খরচ বাড়লে পণ্য উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, এবং সেই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য সুদের হার নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ একই সঙ্গে অর্থনীতি শীতল রাখা এবং প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা দুটোই সামলাতে হয়।


ইরানের কৌশল : চোকপয়েন্ট ডিপ্লোমেসি ও আধিপত্য

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান দীর্ঘদিন ধরেই তার ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে। এই কৌশলকে বলা হচ্ছে “চোকপয়েন্ট ডিপ্লোমেসি”, যার মূল ধারণা হলো একটি সংকীর্ণ সমুদ্রপথকে নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করে বৈশ্বিক জ্বালানি ও এখন ডিজিটাল প্রবাহেও চাপ সৃষ্টি করা। 

এটি ইরানকে সরাসরি সামরিক সংঘাতে না গিয়েও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

হরমুজের বিকল্প রুট ব্যবহার করেও মিলছে না সুবিধা

হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্ন বা বন্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রফতানিকারক দেশগুলো তাদের রফতানি চালু রাখতে বিকল্প রুট ব্যবহারের চেষ্টা করে। এই বিকল্প রুটগুলো মূলত পাইপলাইন ও সমুদ্রবন্দরভিত্তিক অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন, যা পারস্য উপসাগরের কাছাকাছি থাকা তেল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পরিবহন করে। এই রুটের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে সরাসরি পশ্চিমা বাজারে তেল পাঠানো সম্ভব হয়।

একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান–ফুজাইরাহ পাইপলাইন হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে আরেকটি বড় বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করে। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ তেল ক্ষেত্রকে ওমান উপসাগরের ফুজাইরাহ রফতানি টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করেছে, যেখান থেকে সরাসরি সমুদ্রপথে তেল রফতানি করা যায়। 

এছাড়া ইরানসহ কিছু দেশে সীমিতভাবে বিকল্প রুট হিসেবে পাইপলাইন ভিত্তিক রফতানি ব্যবস্থা রয়েছে, যা হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে অন্য সমুদ্রবন্দরের দিকে তেল পাঠানোর সুযোগ দেয়। তবে এই রুটগুলোর সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম এবং নিয়মিতভাবে পুরোপুরি ব্যবহার করা যায় না। 

হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে বিকল্প রুট ব্যবহার করা গেলেও এর অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসব বিকল্প পাইপলাইনের মোট সক্ষমতা হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয় তার তুলনায় অনেক কম। ফলে পুরো চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। বিকল্প রুটগুলো সাধারণত সবসময় পূর্ণ ক্ষমতায় চালু থাকে না। তাই সংকটের সময় অতিরিক্ত তেল পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া যায় না। 

এছাড়াও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেও এসব অবকাঠামো। কারণ কিছু পাইপলাইন ও রফতানি টার্মিনাল ইতোমধ্যেই হামলা বা বিঘ্নের শিকার হয়েছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। একইসঙ্গে বিকল্প রুট ব্যবহার করলে পরিবহন পথ দীর্ঘ হয়ে যায়, ফলে জাহাজ চলাচলের সময়, বীমা খরচ এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।  

সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালী এখন আর শুধু তেল পরিবহনের একটি সংকীর্ণ জলপথ নয়। এটি ধীরে ধীরে এমন এক কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে, যেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের সংঘাত বা প্রতিযোগিতা শুধু সামরিক বা জ্বালানি সীমাবদ্ধ না থেকে ডিজিটাল অবকাঠামো কেন্দ্রিক নতুন রূপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।



/ইউএমএইচ


  বিষয়:   হরমুজ প্রণালী  ইরান 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: