যুদ্ধ, নির্যাতন আর মৃত্যুভয়ের বিভীষিকা পেছনে ফেলে হাজারো মানুষ আশ্রয় নিয়েছে মৌরিতানিয়ার সীমান্তগ্রাম ফাসালা-দুনকারায়। মালিতে চলমান সংঘাতের আগুনে ঘরবাড়ি হারানো এসব মানুষের শরীরে যেমন রয়েছে নির্যাতনের ক্ষত, তেমনি মনে জমেছে গভীর আতঙ্ক, শোক আর দুঃস্বপ্ন। শরণার্থীদের অভিযোগ, সেনাবাহিনী, রুশ ভাড়াটে যোদ্ধা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে।
মালিতে চলমান সংঘাত এখন ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। একদিকে দেশটির সেনাবাহিনী ও তাদের মিত্র রুশ ‘ভাড়াটে’ বাহিনী আফ্রিকা কর্পস— যাদের স্থানীয়রা এখনো ‘ওয়াগনার’ নামেই চেনে। অন্যদিকে আল-কায়েদা ও আইএসআইএল-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং আজাওয়াদ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। উত্তরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে চলছে দখল, হামলা আর পাল্টা হামলা।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার পর অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ মালি ছেড়ে মৌরিতানিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে। তাদের অধিকাংশই এখন সীমান্তবর্তী ফাসালা-দুনকারায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
শরণার্থীরা বলছেন, পুরো গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন সাধারণ মানুষ। কাউকে শিরশ্ছেদ করা হয়েছে, কাউকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে। নারীদের ওপর হয়েছে যৌন নির্যাতন। বেঁচে ফেরা মানুষগুলোর অভিযোগ—সংঘাতে জড়িত প্রায় সব পক্ষই মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত, বিশেষ করে মালির সেনাবাহিনী ও রুশ যোদ্ধারা।
আমরা যেন ফাঁদে আটকে গিয়েছিলাম
৭৫ বছর বয়সী মোকতার ছিলেন লেরে এলাকার কাছে সন্ডাজ গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘ওয়াগনার যোদ্ধারা বারবার আমার গ্রামে হামলা চালিয়েছে। তারা মানুষকে গুলি করত, কখনো শিরশ্ছেদ করে মাথাটা বুকের ওপর রেখে যেত। আমরা নিজের চোখে এসব দেখেছি। সেনাবাহিনী আমাদের জঙ্গিদের সহযোগী বলে অভিযুক্ত করত, আবার জঙ্গিরাও আমাদের বিশ্বাসঘাতক বলত। আমরা মাঝখানে পড়ে গিয়েছিলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘এক সন্ধ্যায় প্রায় ৩০ জন জেএনআইএম সদস্য মোটরসাইকেলে এসে গ্রামের মসজিদে নামাজ পড়ে ঘোষণা দেয়— ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সবাইকে গ্রাম ছাড়তে হবে। চারদিকে শুধু ভয়। ড্রোনের শব্দ শুনলেই মনে হতো মৃত্যু আসছে। রাতের অন্ধকারে পালিয়ে সীমান্ত পার হয়েছি। যা দেখেছি, তা সারা জীবন ভুলব না।’
ওরা আমাদের সারিবদ্ধ করে চাবুক মারত
৩৮ বছর বয়সী মরিয়মা বলেন, ‘আমি এখনও ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখি। গতরাতে স্বপ্নে দেখলাম ওয়াগনার সদস্যরা আমাদের বিছানার নিচে লুকিয়ে আছে। বাড়িতে একবার আমি সত্যিই বিছানার নিচে লুকিয়েছিলাম, কিন্তু তারা আমাকে টেনে বের করে আনে। অভিযানের সময় তারা নারীদের সারিবদ্ধ করে দাঁড় করিয়ে চাবুক মারতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভয়ে কারও কারও প্রস্রাব-পায়খানা হয়ে যেত। কিন্তু তারা লাইন ছাড়তে দিত না। গর্ভবতী নারীরা সন্তান হারাতেন, কেউ কেউ সময়ের আগেই সন্তান জন্ম দিতেন। অনেক নারী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন।’
তিনি জানান, হামলাকারীরা মুখোশ পরত এবং এমন ভাষায় কথা বলত যা স্থানীয়রা বুঝতে পারত না।
দুই ভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে
সন্ডাজের কাদিদিয়া বলেন, ‘আমার দুই ভাই আমার সঙ্গে এখানে ছিল। পরে তারা মোটরসাইকেল নিয়ে সীমান্তের ওপারে কিছু আনতে গিয়েছিল। সেখানেই তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়।’
রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল মেঝে
৬৭ বছর বয়সী সুলাইমানের বাড়ি মপতি অঞ্চলের দিয়োরা এলাকায়।
তিনি বলেন, ‘ওয়াগনার আমাদের গ্রাম থেকে আটজন পুরুষকে ধরে নিয়ে যায়। তারা অভিযোগ করেছিল যে, আমরা জঙ্গিদের সাহায্য করি। আমার ভাই, ছেলে আর চাচাতো ভাইও ছিল।’
‘তারা এত মারধর করেছিল যে মেঝে রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। ৭২ ঘণ্টা হাতকড়া ও চোখ বেঁধে রাখা হয়েছিল। পরে আমাদের একটি কারাগারে নেওয়া হয়। পরিবার ২০ লাখ সিএফএ জামিন দেওয়ার পর ছাড়া পাই।’
বাড়ি ফিরে দেখেন তার মোটরসাইকেলও লুট হয়ে গেছে।
আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল
৪৯ বছর বয়সী হাওয়া বলেন, ‘সেনাবাহিনী ও ওয়াগনার গর্ভবতী নারী পর্যন্ত মারধর করেছে। আমাকে ও মেয়েকেও পিটিয়েছে। এক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিশোরী ভয় পেয়ে দৌড় দিলে তাকে ধাওয়া করে গুলি করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুরুষদের বেঁধে ফেলে বলা হচ্ছিল ছুরি দিয়ে হত্যা করা হবে। আমার ছেলে তাদের মধ্যে ছিল। সে নিজের জন্য নয়, তার বোনদের জন্য বেশি ভয় পাচ্ছিল।’
আমি এখন মৃগীরোগে ভুগছি
২০ বছর বয়সী ফাতিমাতা জানান, হামলার সময় তাকে আলাদা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘এক বিদেশি আমাকে একটি ঘরে নিয়ে যায়। পরে আরও পাঁচজন আসে, তাদের সঙ্গে একজন মালিয়ান সেনাও ছিল। আমি ভেবেছিলাম আমাকে মেরে ফেলবে।’
হামলার পর থেকে তার খিঁচুনি শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি মাঝেমধ্যে জ্ঞান হারাই। আগে কখনো এমন হয়নি। এখন এমএসএফের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছি।’
আমি আমার সন্তান হারিয়েছি
৪২ বছর বয়সী আইসাতা বলেন, ‘আমার ভাই মারা গেছে শুনে আমি ভেঙে পড়ি। পরে আমার গর্ভের সন্তানও নষ্ট হয়ে যায়।’
তিনি বিশ্বাস করেন, প্রার্থনাই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
আমাদের হয়ে কেউ কথা বলে না
৮৫ বছর বয়সী উসমান ২০১২ সালের সংঘাতের সময়ও শরণার্থী হয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘এখন পুরো গ্রাম খালি হয়ে গেছে। সন্ত্রাসীরা আমাদের গ্রামপ্রধানকে হত্যা করেছে। অনেকের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের হয়ে কেউ কথা বলে না।’
মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ভয়াবহ সংকট
ফাসালা-দুনকারা সীমান্তের কাছে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস, যেটি এমএসএফ নামে পরিচিত। এখানেই শরণার্থীদের জন্য একমাত্র মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যায়।
চিকিৎসকরা বলছেন, প্রতিদিন অন্তত ছয়জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
এক এমএসএফ চিকিৎসক জানান, অনেক নারী যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে আসছেন। আমরা মনে করি পুরুষরাও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কিন্তু সামাজিক কারণে তারা মুখ খুলতে পারেন না।
তিনি আরও জানান, এক চার বছরের শিশুকে আনা হয়েছিল, যার পেট ও শরীরে বিস্ফোরণের ভয়াবহ ক্ষত ছিল। আবার এমন মানুষও এসেছেন, যাদের জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল, পরে গ্রামবাসীরা উদ্ধার করেছে।’
যুদ্ধ শেষ হলেও শেষ হয়নি আতঙ্ক
সূর্য ডুবে গেলে শরণার্থী শিবিরে আবারও শিশুদের খেলাধুলা শুরু হয়। গবাদিপশু নিয়ে রাখালেরা ফিরে আসে। জীবন যেন স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু বাস্তুচ্যুত এসব মানুষের চোখে এখনও ভাসে আগুনে পুড়ে যাওয়া গ্রাম, নিখোঁজ স্বজন আর মৃত্যুভয়।
তাদের প্রশ্ন একটাই— কোনো দিন কি তারা আবার নিজেদের ঘরে ফিরতে পারবে?
/কেআই