কাঁটাতারের এপারে-ওপারে ভাগ হওয়া মানুষের জীবনে সীমান্ত চিরকালই এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার নাম। এবার সেই অনিশ্চয়তার মেঘ আরও ঘনীভূত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নতুন চালু হওয়া ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা অস্থায়ী আটক কেন্দ্রগুলোতে। অনুপ্রবেশের অভিযোগে মাত্র এক সপ্তাহেই সেখানে বন্দি করা হয়েছে প্রায় ৪০০ মানুষকে, যাদের ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে দাবি করছে ভারতীয় প্রশাসন। নথিপত্র যাচাইয়ের কড়া আইনি নজরদারির মধ্যেই এখন তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর চূড়ান্ত তোড়জোড় চলছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই সীমান্ত সংকটের ভেতরের চিত্র। রাজ্য প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যাপক অভিযানের মূল ধাক্কাটি লেগেছে সীমান্ত লাগোয়া বসিরহাট পুলিশ জেলায়। সেখান থেকেই আটক করা হয়েছে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৩৩৫ জন মানুষকে। হঠাৎ এত বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য নির্ধারিত কোনো জায়গা না থাকায় তেঁতুলঘাটি, পাথরশাঁতি, চরঘাট ও সুভাষ নগরের বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকেই রাতারাতি রূপ দেওয়া হয়েছে অস্থায়ী কয়েদখানায়।
বসিরহাটের বাইরেও মালদা, মুর্শিদাবাদ, দক্ষিণ দিনাজপুর, কোচবিহার ও বনগাঁর মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতেও বসানো হয়েছে কড়া পাহারা। রাজ্য প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই মানুষদের আটক করা থেকে শুরু করে সীমান্ত পার করার পুরো প্রক্রিয়াটি যেন অত্যন্ত দ্রুত এবং নির্বিঘ্নে শেষ করা হয়। ফলে এই অস্থায়ী কেন্দ্রগুলোতে এখন দিন-রাত রাইফেলধারী পুলিশের অতিরিক্ত টহল চলছে।
আইন আর নথির এই মারপ্যাঁচের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এক একটি রক্ত-মাংসের মানুষের গল্প। এই বন্দিদের ভিড়ে আছেন কেরালা থেকে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ফেরা চার সাধারণ শ্রমিকও। বর্তমানে উত্তর চব্বিশ পরগনার একটি বন্দিশিবিরে দিন কাটছে তাদের।
বন্দিশিবির থেকে মতলেব হোসেন নামের এক যুবক বলেন, ‘গতকাল আমাদের বায়োমেট্রিক তথ্য নেওয়া হয়েছে, আঙুলের ছাপ রাখা হয়েছে। বিএসএফের বাবুরা আমাদের অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। আমরা ভারতে কীভাবে ঢুকেছি, কোথায় থেকেছি, কেরালায় কী কাজ করেছি— সব কিছুর নিখুঁত হিসাব দিতে হয়েছে আমাদের। আমরা তাঁদের সবকিছু জানিয়েছি।’
মতলেবদের মতো এমন শত শত দিনমজুর ও সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ এখন ঝুলে আছে এই হোল্ডিং সেন্টারগুলোর চার দেয়ালের ভেতর। আইনি আনুষ্ঠানিকতা আর কাগজপত্রের হিসাব-নিকাশ শেষ হলেই হয়তো যে-কোনো দিন তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হবে সীমান্তের এপারে।
সময়ের আলো/জেডি