কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্তে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখায় একদিনেরও বেশি সময় ধরে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১২ জন মানুষ বসে আছেন অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের অপেক্ষায়। তাদের মাথার ওপরে খোলা আকাশ, চারপাশে প্রচণ্ড দাবদাহ, সামনে-পেছনে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অবস্থান। কোথাও তাদের নিশ্চিত আশ্রয় নেই।
শুক্রবার (১২ জুন) ভোরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ওই ১২ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করলে স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি টের পেয়ে বিজিবিকে খবর দেন। পরে বিজিবি ও স্থানীয়দের তৎপরতায় তাদের আবার সীমান্তের শূন্যরেখায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় অপেক্ষা।
প্রাগপুর সীমান্তের ১৪৮/৩ এস নম্বর পিলারের কাছাকাছি, ভারতীয় অংশের প্রায় ৫০ গজের মধ্যে একটি পাটক্ষেতের আলে শিমুলগাছের নিচে বসে আছেন তারা। ৪ জন নারী, ৪ জন পুরুষ এবং ৪ জন শিশুসহ মোট ১২ জন মানুষ। শিশুদের বয়স ১০ মাস থেকে ৪ বছরের ভেতর। আরেকজন নারী অন্তঃসত্ত্বা। সীমান্তের ওই নির্জন প্রান্তরে দিনভর তপ্ত রোদে পুড়েছেন তারা। শিশুরা কাঁদছে ক্ষুধায়, নারীরা কাঁদছেন অনিশ্চয়তায়। ক্লান্ত শরীর নিয়ে তারা রাতও কাটিয়েছেন একই জায়গায়। স্থানীয়দের ভাষায়, তারা যেন দেশ হারানো কিছু মানুষ, যারা এখন দুই দেশের মাঝখানের এক টুকরো জমিতে আটকে আছেন।
সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে মাথাভাঙ্গা নদী। নদীর ওপর একটি সাঁকো পার হয়ে স্থানীয় মানুষজন মাঝে মাঝে খাবার ও পানীয় জল নিয়ে যাচ্ছেন সেই অসহায় মানুষগুলোর কাছে। কিন্তু কয়েক প্যাকেট বিস্কুট বা কিছু বোতল পানি কি তাদের অনিশ্চয়তা দূর করতে পারে? সারাদিন কেটে গেছে, রাত পেরিয়েছে, তবু কোনো সমাধান আসেনি। বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শুক্রবার দুই দফায় বৈঠকের সময় নির্ধারণ হলেও তাতে সাড়া দেয়নি বিএসএফ। ফলে রাতটা শূন্যরেখাতেই কাটাতে হয়েছে তাদের।
এ বিষয়ে শনিবার (১৩ জুন) সকালে বিজিবির প্রাগপুর কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার আসাদুজ্জামান বলেন, ‘শনিবার পতাকা বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, তবে ফল কী হবে তা এখনও অনিশ্চিত।’
এদিকে শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে দৌলতপুর সীমান্তের ধর্মদহসহ আরও কয়েকটি এলাকায় নতুন করে পুশ-ইনের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে বিজিবি। তাই সীমান্তজুড়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি বাহিনী। বাংলাদেশ অংশে মাথাভাঙ্গা নদীর পাড়ে স্থানীয় গ্রামবাসীরাও নজরদারিতে সহযোগিতা করছেন। বিজিবির আশঙ্কা, রাতের অন্ধকারে আরও জোরালোভাবে পুশ-ইনের চেষ্টা হতে পারে।
কিন্তু সীমান্তের কাঁটাতার, কূটনৈতিক আলোচনা কিংবা নিরাপত্তা কৌশলের বাইরে আরেকটি বাস্তবতা আছে- সেটি হলো ‘মানুষ’। সেই মানুষগুলো শূন্যরেখার নিঃসঙ্গ জমিতে বসে খুঁজছে নিজের দেশ, মানবতার ঠিকানা।
/মহু