আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যার ব্যাখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। কখনো অপ্রত্যাশিত সাফল্য, কখনো হঠাৎ বিপদ, কখনো প্রাপ্তি আবার কখনো বঞ্চনা; এসবের পেছনে কী রহস্য কাজ করে?
ইসলামের দৃষ্টিতে এর উত্তর নিহিত রয়েছে আল্লাহ তায়ালার সর্বময় ইচ্ছা ও তকদির বা নিয়তির বিশ্বাসে। ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে তকদিরের প্রতি বিশ্বাস অন্যতম। একজন মুমিন বিশ্বাস করে সৃষ্টিজগতের প্রতিটি ঘটনা আল্লাহর জ্ঞান, ইচ্ছা ও প্রজ্ঞার অধীনেই সংঘটিত হয়। আসমান-জমিনের কোথাও এমন কিছু ঘটে না যা তাঁর জ্ঞানের বাইরে। তিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্যক অবগত। মানুষের দৃষ্টিতে অনেক কিছু অনিশ্চিত মনে হলেও আল্লাহর কাছে সবই সুস্পষ্ট ও নির্ধারিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাণ অনুযায়ী’ (সুরা কামার, আয়াত : ৪৯)।
এই আয়াত সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণের এক মৌলিক সত্য তুলে ধরে। গ্রহ-নক্ষত্রের গতি থেকে শুরু করে মানুষের জীবনচক্র সবকিছুই মহান আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
নিয়তির আলোচনায় সুরা তাগাবুনের একটি আয়াত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদ আপতিত হয় না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, তিনি তার অন্তরকে হেদায়েত দান করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবগত’ (সুরা তাগাবুন, আয়াত : ১১)।
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়, মুমিন যখন উপলব্ধি করে যে তার জীবনে আসা সুখ-দুঃখ সবই আল্লাহর জ্ঞাতসারে ঘটছে, তখন তার হৃদয়ে এক ধরনের প্রশান্তি জন্ম নেয়। সে বিপদের সময় হতাশ হয় না এবং সুখের সময় সীমালঙ্ঘন করে না। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যে এমন কোনো মসিবত আপতিত হয় না, যা আমি সংঘটিত করার আগে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখি না। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে খুব সহজ’ (সুরা হাদিদ, আয়াত : ২২)।
এর পরের আয়াতে এই ঘোষণার উদ্দেশ্যও স্পষ্ট করা হয়েছে, ‘যাতে তোমরা আফসোস না করো তার ওপর যা তোমাদের থেকে হারিয়ে গেছে এবং তোমরা উৎফুল্ল না হও তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন তার কারণে। আর আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না’ (সুরা হাদিদ, আয়াত : ২৩)।
এই আয়াতের শিক্ষায় স্পষ্ট যে, তকদিরের বিশ্বাস মানুষের মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করে। এটি মানুষকে হতাশা ও অহংকার উভয় চরমপন্থা থেকে দূরে রাখে। সে বুঝতে শেখে, জীবনের প্রতিটি অবস্থাই একেকটি পরীক্ষা।
তবে ইসলামে তকদিরের বিশ্বাস কখনো কর্মবিমুখতার নাম নয়। অনেকেই মনে করেন যখন সবকিছু আগেই নির্ধারিত, তখন চেষ্টা-সাধনার কী প্রয়োজন? কুরআন এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়’ (সুরা নাজম, আয়াত : ৩৯)।
এই আয়াত প্রমাণ করে যে মানুষের দায়িত্ব হলো চেষ্টা করা। ফলাফল আল্লাহর হাতে, কিন্তু চেষ্টা করা মানুষের কর্তব্য। নিয়তির প্রতি বিশ্বাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায় সুরা তওবার আয়াতে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘বলুন, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করে দিয়েছেন তা ছাড়া অন্য কোনো কষ্ট আমাদের কিছুতেই স্পর্শ করবে না। তিনিই আমাদের অভিভাবক। আর আল্লাহরই ওপর যেন মুমিনরা তাওয়াক্কুল করে’ (সুরা তওবা, আয়াত : ৫১)।
এই আয়াত একজন মুমিনকে ভয়, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মাঝেও সাহস জোগায়। সে জানে, মানুষের পরিকল্পনার ঊর্ধ্বে রয়েছে আল্লাহর পরিকল্পনা, আর তাঁর ফয়সালার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত কল্যাণ।
বর্তমান যুগে মানুষ নানা ধরনের মানসিক চাপ, ভবিষ্যৎ ভীতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। সামান্য ব্যর্থতায় কেউ হতাশ হয়ে পড়ে, আবার সাময়িক সাফল্যে কেউ আত্মগর্বে আক্রান্ত হয়।
এমন বাস্তবতায় তকদিরের সঠিক উপলব্ধি মানুষের জন্য এক অনন্য মানসিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির উৎস হতে পারে।
কারণ এই বিশ্বাস মানুষকে শেখায় প্রচেষ্টা তার দায়িত্ব, আর ফলাফলের মালিক আল্লাহ। নিয়তির রহস্য মানুষের সীমিত জ্ঞানে সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। কিন্তু একজন মুমিন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে মহান আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান ও পরম প্রজ্ঞাময়।
তাই সুখে-দুঃখে, প্রাপ্তিতে-অপ্রাপ্তিতে, স্বস্তিতে-সংকটে একজন ঈমানদার বান্দা আল্লাহর প্রতি আস্থা রাখে এবং তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করে। নিয়তির প্রতি এই বিশ্বাসই মানুষকে ধৈর্যশীল করে, আশাবাদী করে এবং জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের শিক্ষা দেয়। আর এটাই ইসলামের দৃষ্টিতে তকদিরের প্রকৃত তাৎপর্য।
/এসএকে