কূটনীতি কোনো পাঠ্যবইয়ের সংজ্ঞা দিয়ে বোঝা যায় না, এটি মূলত রাষ্ট্রীয় আচরণের ভাষা। এখানে বড় বড় শব্দ বা আনুষ্ঠানিক বিবৃতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তব আচরণ, সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা এবং প্রটোকলের প্রতি শ্রদ্ধা। অনেক সময় একটি বিবৃতি যতটা না সম্পর্কের অবস্থান বোঝায়, তার চেয়ে বেশি স্পষ্টভাবে তা বোঝায় কোনো প্রতিনিধির সঙ্গে আচরণ। একটি বৈঠকে আমন্ত্রণ যেমন কূটনৈতিক বার্তা, তেমনি বিমানবন্দরে কোনো উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিকে আড়াই ঘণ্টা আটকে রাখা নিছক প্রশাসনিক বিলম্ব নয়। এটি নিশ্চিতভাবেই একটি রাজনৈতিক সংকেত।
এ ধরনের আচরণ কখনোই নিরপেক্ষ থাকে না। এটি স্বাভাবিকভাবেই একটি অস্বস্তিকর বার্তা তৈরি করে। কূটনৈতিক শিষ্টাচারের দৃষ্টিতে প্রশ্ন ওঠে, রাষ্ট্র কি পারস্পরিক সম্মানের নীতি মানছে, নাকি সম্পর্ককে ইচ্ছাকৃতভাবে চাপের মধ্যে রাখছে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এমন ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কেও একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে যায়।
আরও পড়ুন
গত রোববার দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি তাই সাধারণ প্রশাসনিক জটিলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রাখে। এ তথ্যই একটি কূটনৈতিক অস্বস্তির ইঙ্গিত দেয়। এরপর প্রবেশের অনুমতি মিললেও তিনি দিল্লিতে না গিয়ে কলম্বো হয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন, যা ঘটনার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
দিল্লি এয়ারপোর্টের ঘটনাকে হয়রানি উল্লেখ করে মঙ্গলবার ডা. জাহেদ বলেছেন, ‘আমি যেকোনো জায়গায় বসতে পারি। কিন্তু আমি যেহেতু দেশের একটা পজিশন হোল্ড করি, সুতরাং আমি সেই জায়গাটার সম্মান চেয়েছি। পরে তারা আমাকে ভালো জায়গায় বসাতে চেয়েছে, আমি যাইনি। বাংলাদেশ তাদের আত্মমর্যাদা বিকিয়ে দিয়ে কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক করবে না। এটি ব্যক্তির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের, জনগণের সঙ্গে জনগণের। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ছাড় নেই।’
ডা. জাহেদ উর রহমান কোনো সাধারণ যাত্রী নন। তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার একজন উপদেষ্টা এবং রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নে যুক্ত উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি। তিনি একটি আঞ্চলিক বহুপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়েছিলেন। তার সফর সম্পর্কে বাংলাদেশ হাইকমিশন আগেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছিল। অর্থাৎ প্রটোকলগত প্রস্তুতি বিদ্যমান ছিল।
তারপরও ঘটনাটি ঘটেছে, যা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বাইরে প্রশ্ন তোলে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কি বিষয়টি যথাযথভাবে ইমিগ্রেশন পর্যায়ে জানায়নি, নাকি সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে অনিশ্চয়তা তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি ব্যাখ্যাই আলাদা মাত্রার উদ্বেগ তৈরি করে। কারণ যেটিই সত্য হোক, ফলাফল দাঁড়ায় একটি অস্বস্তিকর কূটনৈতিক পরিস্থিতি।
কূটনৈতিক প্রটোকলের ভাষায় উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিকে আগাম অবহিত করা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় আটকে রাখা শিষ্টাচারগত লঙ্ঘনের মধ্যে পড়ে। এটি ব্যক্তিগত অসম্মান নয়; বরং রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রতি একটি বার্তা। কূটনীতিতে এমন আচরণকে অনেক সময় ইচ্ছাকৃত ‘সিগন্যালিং’ হিসেবে দেখা হয়, যেখানে সরাসরি কিছু না বলেও আচরণের মাধ্যমে অবস্থান প্রকাশ করা হয়।
কূটনীতির এই সিগন্যালিংয়ের শাব্দিক অর্থ যাই হোক, সাধারণত এর মাধ্যমে ছোট আচরণের বড় বার্তা দেওয়া হয়। বিমানবন্দরে আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রাখা, কারণ ব্যাখ্যা না করা, আবার পরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়াÑ এই সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি একটি পরোক্ষ বার্তা। যেটি বুঝিয়ে দেয়, বাংলাদেশকে যেকোনো সময় অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলা সম্ভব এবং এর জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ব্যয় বহন করতে হবে না। এ ধরনের সিগন্যাল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে।
ঘটনাটি নিয়ে একটু ভাবলেই প্রশ্নগুলো জাগে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কি সেই কূটনৈতিক পত্র পায়নি? পেলে তা কি ইমিগ্রেশনকে জানানো হয়নি? নাকি জেনেশুনেই এই অনিশ্চয়তার ফাঁদে ফেলা হয়েছে? যেকোনো উত্তরই ভয়াবহ। প্রথম দুটো উত্তর রাষ্ট্রীয় সমন্বয়ের করুণ ব্যর্থতার প্রমাণ। আর শেষ উত্তরটি সুচিন্তিত অপমান। কূটনৈতিক প্রটোকলের ভাষায় এটি কোন ধরনের আচরণ? একটি রাষ্ট্রের সিনিয়র প্রতিনিধিকে আগাম জানিয়েও প্রবেশ দিতে অস্বীকার করা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন। এটি ব্যক্তির অপমান নয়, রাষ্ট্রের অবমাননা।