সাড়ে ৭০০ বছরের প্রথায় টানা হচ্ছে লাগাম

দিপু সিদ্দিকী

সারাদেশ

সিলেটের ঐতিহাসিক হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজারে দান ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একের পর এক পদক্ষেপ নিয়েছে জেলা

2026-06-21T13:39:59+00:00
2026-06-21T15:43:38+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
সারাদেশ
শাহজালাল মাজারে ভক্তদের দান
সাড়ে ৭০০ বছরের প্রথায় টানা হচ্ছে লাগাম
দিপু সিদ্দিকী
প্রকাশ: রোববার, ২১ জুন, ২০২৬, ১:৩৯ পিএম  আপডেট: ২১.০৬.২০২৬ ৩:৪৩ পিএম
পুরোনো দানের ডেগ সিলগালা করা হয়েছে। ছবি : সময়ের আলো
সিলেটের ঐতিহাসিক হযরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজারে দান ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একের পর এক পদক্ষেপ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। পুরোনো দানের ডেগ সিলগালা, নতুন দানবাক্স স্থাপন, তাতে তালা লাগানো, আনসার সদস্য মোতায়েন এবং সর্বশেষ সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনকে ঘিরে মাজার-সংশ্লিষ্টদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তবে প্রশাসনের দাবি, দানের অর্থের সঠিক হিসাব সংরক্ষণ এবং জনআস্থা বৃদ্ধিই এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

গত শুক্রবার (১২ জুন) হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)’র মাজার পরিদর্শনে যান সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলম। পরিদর্শনকালে তিনি বিদ্যমান দানবাক্সে তালা লাগানোর নির্দেশ দেন। এর আগে, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন, ওয়াক্‌ফ এস্টেট, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও মাজার কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে একাধিক বৈঠকে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় হিসাব সংরক্ষণ ও জবাবদিহিতা নিয়ে আলোচনা হয়।

এর ধারাবাহিকতায় ১৮ জুন বিকেলে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিতিতে মাজারের ৩টি ঐতিহাসিক পিতলের দানের ডেগ সিলগালা করা হয়। একইসঙ্গে মাজারের মূল ফটকসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১টি বড় কেন্দ্রীয় দানবাক্স এবং কয়েকটি ছোট দানবাক্স স্থাপন করা হয়। এসব দানবাক্সের নিরাপত্তা ও তদারকির জন্য আনসার সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।


সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে মাজারে দানের অর্থ সংগ্রহ ও বণ্টনের ক্ষেত্রে অনিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু ছিল, যেখানে দানের অর্থ হাতে হাতে গ্রহণ করা হতো।’ তিনি বলেন, ‘মাজারে প্রদত্ত দান জনগণের অর্থ এবং এর ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।’

তিনি জানান, মাজারের আয়-ব্যয়ের কোনো সুসংগঠিত হিসাবপত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাওয়া যায়নি। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি অর্থায়নে মাজারে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ভবন নির্মাণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ২৫ কোটি টাকা সরকার দিচ্ছে এবং বাকি ৫ কোটি টাকার একটি অংশ মাজার কর্তৃপক্ষের দেওয়ার কথা থাকলেও আয়ের উৎস ও হিসাব সংক্রান্ত প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি। পরিকল্পনা কমিশনের অনুসন্ধানের সময়ও মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ হিসাব উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানান।

ডিসির ভাষ্য অনুযায়ী, মাজার, মসজিদ ও মাদরাসাকে সমন্বিত করে একটি আধুনিক ইসলামিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মাদরাসাকে উচ্চমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্নীত করার উদ্যোগও নেওয়া হবে।

এদিকে, ডেগ সিলগালার পর একদল মাজার-ভক্ত দরগাহ প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন। তাদের অভিযোগ, শত শত বছরের প্রচলিত রীতিতে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অনুসারী বলেন, ‘প্রায় সাতশ বছর ধরে চলে আসা দান ব্যবস্থাপনায় হঠাৎ পরিবর্তন আনা ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’


দরগাহের অন্যতম খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন (মুন্না) জানান, দানবাক্স সিলগালার প্রক্রিয়াটি যথাযথ নয় এবং এটি মাজার ও অলি-আউলিয়াবিরোধী কর্মকাণ্ড বলে তিনি মনে করেন। তার দাবি, দানের অর্থ শুধু খাদেমদের জন্য ব্যয় হয় না, বরং মসজিদ, মাদরাসা ও মাজারের উন্নয়নেও ব্যবহার করা হয়। হিসাব চাওয়ার অধিকার সবার থাকলেও জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি তিনি সমর্থন করেন না।

এদিকে, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২০ জুন বিকেলে দানবাক্সগুলোর ওপর সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এর মাধ্যমে দানবাক্সের কার্যক্রম সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং দান ব্যবস্থাপনায় জনআস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে।

জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম বলেন, মানুষ চায় তাদের দেওয়া দানের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তা জানার সুযোগ থাকুক। হিসাব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে দানকারীদের আস্থাও বাড়বে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, মাজারের আয়ের কোনো অর্থ সরকার গ্রহণ করবে না, বরং তা মাজার ও জনকল্যাণমূলক কাজেই ব্যয় হবে।

মাজারের দানবাক্সে তালা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা চলছে। একদিকে মাজার-সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ ঐতিহ্য রক্ষার কথা বলছেন, অন্যদিকে অনেকেই মনে করছেন, দানের অর্থের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।


সিলেট জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, আগামী এক মাস জেলা প্রশাসন, ওয়াক্‌ফ এস্টেট ও মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে দানের আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করবে। এ সময়ে দানের উৎস, ব্যয়ের খাত এবং ব্যবস্থাপনা কাঠামো পর্যালোচনা করে একটি স্থায়ী ও জবাবদিহিমূলক নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য মাজারের দানের অর্থ নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। তবে মাজার-সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের আশঙ্কা, এর মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনিক প্রভাব বাড়তে পারে।

অভিযোগ রয়েছে, শত শত বছর ধরে শাহজালাল মাজারে ভক্তদের দানের টাকা মাজারের খাদেম পরিবারের মধ্যে বণ্টন করে থাকেন। এ ছাড়া দান হিসেবে আসা গরু, ছাগল, মুরগীও এসব পরিবার নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেন। দানের টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করার বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে একাধিক খাদেম প্রকাশ্যে স্বীকারও করেছেন। 

শাহজালাল (রহ.) মাজারে চলমান এই বিতর্ক এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে- শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে কীভাবে আধুনিক জবাবদিহিমূলক দান ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা যায়। আপাতত সেই সমন্বয়ের পথ খুঁজছে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   শাহজালাল  মাজার  প্রথা  ভক্ত  সিলেট 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: