বর্ষার মৌসুম শুরু হলে কক্সবাজার জেলার টেকনাফে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী হাজারও মানুষের মধ্যে নেমে আসে আতঙ্ক। কয়েকদিনের টানা কিংবা ভারী বৃষ্টিপাত হলেই বাড়তে থাকে পাহাড়ধসের আশঙ্কা। জীবিকার তাগিদ, দারিদ্র্য এবং বিকল্প আবাসনের অভাবে ঝুঁকি জেনেও এসব পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করছেন নিম্ন আয়ের অসংখ্য পরিবার। ফলে প্রতি বর্ষাতেই প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা নতুন করে সামনে আসে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত পাহাড়গুলোতে নতুন করে বসতি স্থাপন বন্ধ না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। শুধু গত এক বছরে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ১২টি পাহাড়ে শতাধিক নতুন ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ঘরে বর্তমানে হাজারও মানুষ বসবাস করছেন। ভারী বর্ষণ হলে যেকোনও সময় পাহাড়ধসে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতে পারে বলে ধারণা হচ্ছে।
হ্নীলা পানখালী ও আলী আকবর পড়ার রহিম ও জসিম জানান, রাতে অবৈধভাবে পাহাড়ি মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় কিছু ভূমি দস্যু, যার কারণে বর্ষা এলে পাহাড়ের পাশে বসবাসকারীদের আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়।
টেকনাফ দক্ষিণ বন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুসারে, উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি পাহাড় ও ১১টি টিলায় বসতি আছে। বন বিভাগের ৩৯ হাজার হেক্টর বনভূমিতে সব মিলিয়ে অবৈধভাবে বসবাস করছে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিকসহ অর্ধলাখ মানুষ। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে উপজেলা পরিষদসংলগ্ন ফকিরামোরা, ধুমপেরাং ঘোনা, গিলাতলি, বৈদ্যরঘোনা, নাজিরঘোনা, শিয়াইল্যার ঘোনা, উরমের ছড়া, নতুন পল্লানপাড়া, ফকিরামুড়া, বৈদ্যোরঘোনা, কুয়েত মসজিদ এলাকা, পুরান পল্লানপাড়া, নাইট্যংপাড়া, বরইতলী, ঘুমতলী, মরিচ্যাগুনা, পশ্চিম সিকদারপাড়া, মুরাপাড়া, লেচুয়াপ্রাং, ভিলেজারপাড়া, পশ্চিম রঙ্গীখালী, গাজীপাড়া, আলীখালী, লম্বাবিল, রইক্ষ্যং, করাচীপাড়া, কতুবদিয়াপাড়া, আমতলী, দৈংগাকাটা, হরিখোলা, কেরুনতলী, বালুখালী, চাকমারকুল, কম্বনিয়াপাড়া, শিয়াইল্যামুরা, সাতঘরিয়াপাড়া, হাছইন্নাটেক, শামলাপুর পুরানপাড়া, বড় ডেইল, মাথাভাঙ্গা জাহাজপুরা, মারিষবুনিয়া ও বাইন্যাপাড়া।
টেকনাফ পৌরসভার শিয়াল্ল্যাগুনা এলাকার বাসিন্দা ও পেশায় জেলে মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘ভারী বৃষ্টি হলে পাহাড়ে থাকা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। সবসময় পাহাড়ধসের ভয় কাজ করে। কিন্তু অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বলেই ঝুঁকি নিয়ে এখানে বসবাস করছি।’
একই এলাকার বাসিন্দা নুর ফাতেমা বলেন, ‘সামর্থ্য না থাকায় প্রায় ১০ বছর আগে পাহাড়ি এলাকায় বসবাস শুরু করি। কয়েকদিন ভারী বৃষ্টি হলেই আতঙ্কে থাকতে হয়। কখন পাহাড় ভেঙে পড়ে সেই শঙ্কা কাজ করে। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য বর্ষাকালে পাহাড়ি সরু পথ দিয়ে চলাচল করাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।’
বন বিভাগ সূত্র অনুসারে, গত কয়েক দশকে টেকনাফে পাহাড় ধসে অর্ধশতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে ২০১০ সালের ১৫ জুন। সেদিন টেকনাফের ফকিরামোরা, টুন্ন্যামোরা ও হ্নীলা সিকদারপাড়ায় পাহাড় ধসে ৩৪ জন নিহত হন। একই ঘটনায় দেড় শতাধিক বসতবাড়ি বিধ্বস্ত হয় এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। ২০০৯ সালের ৪ ও ৬ জুলাই ফকিরামোরা ও টুন্ন্যামোড়ায় পাহাড় ধসে একই পরিবারের চার সদস্যসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়। আরও আগে, ১৯৮৯ সালে ফকিরামোরায় এক পরিবারের সাতজনসহ ১১ জন প্রাণ হারান।
টেকনাফ রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুর রশিদ আহমেদ বলেন, ‘পাহাড়ি এলাকায় নতুন কোনো অবৈধ বসতি স্থাপন করতে দেওয়া হচ্ছে না। একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বন বিভাগ কাজ করছে।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে উপজেলার ধসপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে। ভারী বৃষ্টি হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, আজকেও মাইকিং হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিওর সহযোগিতায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।’
সময়ের আলো/মহু