বিলুপ্তপ্রায় বর্ষাতির গল্প ‘ঘঙ’

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

বৃষ্টি থেকে শরীর বাঁচাতে আমরা ব্যবহার করি ছাতা কিংবা রেইনকোট। এসবের অনুপস্থিতিতে কখনও কখনও শাড়ির আঁচল কিংবা ওড়না হয়ে ওঠে

2026-06-25T18:17:03+00:00
2026-06-25T18:17:03+00:00
 
  শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬,
৬ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
ফিচার
বিলুপ্তপ্রায় বর্ষাতির গল্প ‘ঘঙ’
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ৬:১৭ পিএম 
সন্তান কোলে ঘঙ মাথায় দিয়ে বসে আছেন মা। ছবি : সংগৃহীত
বৃষ্টি থেকে শরীর বাঁচাতে আমরা ব্যবহার করি ছাতা কিংবা রেইনকোট। এসবের অনুপস্থিতিতে কখনও কখনও শাড়ির আঁচল কিংবা ওড়না হয়ে ওঠে ভেজা থেকে রক্ষা পাওয়ার খানিক অবলম্বন। কিন্তু আজ বলবো এমন এক বিলুপ্তপ্রায় বর্ষাতির গল্প, যা শুধু বৃষ্টি থেকেই মানুষকে রক্ষা করে না, বরং তা অনন্য এক শিল্পও বটে। পুরুলিয়া জেলার সেই নিজস্ব শিল্পকে বলা হয় ‘ঘঙ’, যার অর্থ গরিবের বর্ষাতি।

বাংলার আনাচেকানাচে ছড়িয়ে রয়েছে শত হাজার শিল্প। বিশেষ করে গাঁয়ের মানুষদের ভেতর শিল্পের চাষাবাদ করতে দেখা যায় বেশি। কখনও তারা সূঁচ-সুতো দিয়ে জীবনের গল্প বোনেন, কখনও রঙতুলির টানে সাজিয়ে তোলেন মাটির ঘর, কখনও গাছের পাতা দিয়ে হরেক রকম শিল্প তৈরি করেন। গ্রামবাংলার মানুষগুলোই যেন এক একটা জীবন্ত শিল্প।


কুটিরশিল্প, হস্তশিল্প এবং লোকসংস্কৃতির জন্য পুরুলিয়ার রয়েছে বিশ্বজোড়া খ্যাতি। একদিকে জেলার বাঘমুন্ডি ব্লকের চারিদা গ্রামের ছৌ নাচের মুখোশ জিআই স্বীকৃতি প্রাপ্ত। অন্যদিকে, মাহালি সম্প্রদায়ের মানুষের তৈরি বাঁশের কুলো, ঝুড়ি, ঝাড়ু এবং নানা ধরনের গয়না ও স্যুভেনির খুব জনপ্রিয়। আবার রঘুনাথপুর এবং ছড়রা এলাকা তাঁত শিল্পের জন্য বিখ্যাত। এখানকার হাতে বোনা তসর শাড়ি ও সুতির গামছার চাহিদা রয়েছে বেশ। এ ছাড়া নিজস্ব সংস্কৃতি ও বন্যপ্রাণীর ছবি ফুটিয়ে তুলে মাটির দেয়ালে নকশা করা জঙ্গলমহলের লোকশিল্প দেশ-বিদেশের পর্যটকদের মুগ্ধ করে। পাহাড়ি পরিবেশ, আদিবাসীদের জীবনযাত্রা, লোকশিল্প সবকিছু মিলে পুরুলিয়া এক সমৃদ্ধ জনপদ।

বাড়ির উঠানে ঘঙ তৈরির কাজ চলছে।

বাড়ির উঠানে ঘঙ তৈরির কাজ চলছে।


এই সুন্দর পাহাড়ি জনপদে বর্ষা মৌসুমে প্রবল বৃষ্টি হয়। সেই বৃষ্টি থেকে বাঁচতে একসময় তৈরি করা হতো ভিন্ন ধাঁচের বর্ষাতি, যা পুরুলিয়ার কয়েকশ বছরের ঐতিহ্য এবং এখন বিলুপ্তপ্রায়। সেই বর্ষাতি শিল্পের নামই ‘ঘঙ’ বা ‘ঘোঙ’। বৃষ্টির কারণে চাষাবাদের কাজে বা শস্যের যত্ন নিতে সমস্যা হতো সেখানকার চাষীদের। কিন্তু সেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামর্থ্য ছিল না, ছাতা বা রেইনকোট কিনে ব্যবহার করার। তাই তারা প্রকৃতির দ্বারস্থ হয়। চিহড় পাতা ও সুতো দিয়ে বানিয়ে ফেলে ঘঙ।

ঘঙ মাথায় দিয়ে মাঠে কাজ করছেন চাষীরা।

ঘঙ মাথায় দিয়ে মাঠে কাজ করছেন চাষীরা।


এই শিল্প তৈরির কাজ আগে প্রায় সব বাড়িতেই হতো। গ্রীষ্ম মৌসুমে চলত পাতা সংগ্রহের কাজ। তারপর পাতাগুলো রোদে শুকানো হতো। যখন ধীরে ধীরে পাতার রঙ সবুজ থেকে হালকা তামাটে হয়ে যেত, তখনই শুরু হতো ‘ঘঙ’ বোনার কাজ। বর্ষার শুরুতে গাঁয়ের মেয়ে-বউরা বসে যেত এ শিল্প তৈরির কাজে। সজারুর কাঁটা দুদিকে ধারালো করে, তা দিয়ে একটা পাতার নিচে দুটো পাতা, তলায় আবার তিন, চারটে পাতা, সেগুলোর নিচে আরও পাতা দিয়ে পর্যায়ক্রমে চলতে থাকে সেলাই। সেলাই করতে করতে সামনের দিকটা পিরামিড আকৃতির রূপ নিতে থাকে। কিছু ঘঙ আকারে ছোট হয়, কিছু আবার বড়। মূলত, বয়সভেদে ভিন্ন ভিন্ন আকৃতির ঘঙ তৈরি করা হয়। এই শিল্প তৈরি করা বেশ সময় এবং ধৈর্যের কাজ। নিত্যদিনের গার্হস্থ্য কাজের ফাঁকে বুনতে বুনতে কয়েকদিনে পূর্ণতা পায় একটি ঘঙ। প্রতিটি ঘঙের ওজন সাধারণত তিন থেকে চার কেজি। উপায়ান্তর না থাকায় ভারী বর্ষাতিই ব্যবহার করতে হতো চাষীদের। বোনা শেষ হলে বৃষ্টির ভেতর সেই বর্ষাতি মাথায় নিয়ে মাঠে কাজ করতে যেতেন তারা।

তবে, সময় বদলেছে। এখন সেখানে বিভিন্নরকম সিন্থেটিক উপাদান দিয়ে স্বল্প দামি ঘঙ তৈরি করা হয়, যা ওজনেও হালকা। তাই চিহড়ের তৈরি ঘঙ এখন বিলুপ্তপ্রায়। যদিও এখনও বেলপাহাড়ী অঞ্চলের আদিবাসীদের কারও কারও ঘরে আগের সেই বর্ষাতি খুঁজে পাওয়া যাবে। তা এখন ব্যবহৃত না হলেও স্মৃতির মাদুর বিছিয়ে ঘরের এক কোণে রয়ে গেছে যত্নে। এ ছাড়া, আষাঢ় মাসে ঝাড়খন্ড ও পশ্চিমবঙ্গের মিলিত কানাইসর পাহাড় পূজো মেলায় চিহড় পাতার টুপি বিপুল বিক্রি হয়। তাই আশা করাই যায়, উপযুক্ত পদক্ষেপ নিলে এখনও শিল্পটিকে রক্ষা করা সম্ভব।

সময়ের আলো/মহু



  বিষয়:   বিলুপ্ত  বর্ষাতি  ঘঙ  পুরুলিয়া  চিহড়  ঐতিহ্য  আদিবাসী  চাষী  কৃষক  বৃষ্টি 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: