ময়মনসিংহের ত্রিশালে লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (এলডিডিপি) আওতায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত খামারিদের জন্য বরাদ্দকৃত উপকরণ বিতরণ না করে, প্রায় অর্ধকোটি টাকা
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নাজনীন সুলতানা। ছবি : সংগৃহীত
ময়মনসিংহের ত্রিশালে লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (এলডিডিপি) আওতায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত খামারিদের জন্য বরাদ্দকৃত উপকরণ বিতরণ না করে, প্রায় অর্ধকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নাজনীন সুলতানার বিরুদ্ধে। প্রকল্পের শতাধিক উপকারভোগী এমন অভিযোগ করেছেন।
ত্রিশাল উপজেলা প্রাণিসম্পদ দফতরের নথি সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে শুরু হওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি এলডিডিপি প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ৩০ জুন ২০২৬। উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে মোট ১৪টি প্রডিউসার গ্রুপ (পিজি) গঠন করা হয়। এর মধ্যে ছিল ১০টি ডেইরি পিজি এবং একটি করে বিফ ফ্যাটেনিং (রিষ্ট-পিষ্ট), ভেড়া, ছাগল ও গরু পালন পিজি। প্রতিটি গ্রুপে ৪০ জন করে সদস্য অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
উপকারভোগীদের অভিযোগ, প্রশিক্ষণ শেষে ডেইরি পিজির প্রত্যেক সদস্যকে সাত ধরনের প্রয়োজনীয় উপকরণ দেওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশই তা পাননি। একইভাবে প্রতিটি পিজির জন্য বরাদ্দ ৫০টি প্লাস্টিকের চেয়ার, ৪টি হাতল চেয়ার ও ৩টি টেবিলও সদস্যদের কাছে পৌঁছেনি।
অভিযোগ রয়েছে, এসব মালামাল বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি অনিয়ম আড়াল করতে কিছু উপকরণ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেই বিতরণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এছাড়া প্রতিটি প্রশিক্ষণে জনপ্রতি ১৫০ টাকা খাবার বাবদ এবং দুই দিনের প্রশিক্ষণে ৪০ জন সদস্যের জন্য ২ হাজার ৮০০ টাকা নাস্তা বাবদ বরাদ্দ থাকলেও, অধিকাংশ সদস্য সেই সুবিধা পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। চার মাসে আটটি সভার জন্য প্রতিটি পিজিতে বরাদ্দ ১ হাজার ৬০০ টাকারও কোনো হিসাব সদস্যদের জানানো হয়নি।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দফতর, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ। ছবি : সময়ের আলো
তালিকাভুক্ত শতাধিক উপকারভোগীর সঙ্গে কথা বলে, এসব অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।
দফতর সূত্রে জানা যায়, ডেইরি পিজির সদস্যদের প্রশিক্ষণ শেষে দুধের ক্যান, বালতি, মিল্ক টেস্টিং সেন্সর, এক জোড়া গামবুট, হ্যান্ড গ্লাভস ও দুধ মাপার সেট দেওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি প্রতিটি ডেইরি পিজির জন্য একটি করে ঘাস কাটার মেশিন ও দুধ দোয়ানোর মেশিন বরাদ্দ ছিল। এছাড়া প্রতিটি পিজি অফিসের জন্য ৫০টি প্লাস্টিকের চেয়ার, ৪টি হাতল চেয়ার ও ৩টি টেবিল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
কোনাবাড়ী ডেইরি পিজির সদস্য আব্দুল কাদের জিলানী বলেন, ‘আমি প্রশিক্ষণ নিয়েছি, কিন্তু কোনো ধরনের উপকরণ পাইনি। প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই মালামাল বিক্রি করে দিয়েছেন। শুধু আমি নই, আরও অনেক সদস্য উপকরণ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার উপজেলা প্রাণিসম্পদ দফতরে আবেদন করেও কোনো প্রতিকার পাইনি।’
একই পিজির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমি প্রশিক্ষণে শুধু খাবার পেয়েছি। পরে কয়েকটি সভায় অংশ নিলেও কোনো নাস্তা বা ভাতা পাইনি। শুরুতে উপকরণ বিতরণের তালিকায় আমার নামও ছিল না। পরে ফোন করে ডেকে আমাকে কিছু উপকরণ দেওয়া হয়।’
কোনাবাড়ী ডেইরি পিজির সদস্য রিনা বেগমের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে, ফোনটি রিসিভ করেন তার মেয়ে। তিনি উপজেলা প্রাণিসম্পদ দফতরে কর্মরত বলে জানান।
স্থানীয়দের দাবি, রিনা বেগম প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ না করলেও প্রকল্পের উপকরণ পেয়েছেন। তবে এ বিষয়ে রিনা বেগমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হরিরামপুর ডেইরি পিজির সদস্য মোছা. ছালমা খাতুন ও বুলবুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা প্রশিক্ষণ নিয়েছি, কিন্তু কোনো উপকরণ পাইনি। পরে জানতে পেরেছি, আমাদের নামে বরাদ্দকৃত উপকরণ উত্তোলন করে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।’
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নাজনীন সুলতানার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও, তিনি তথ্য ও বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। প্রথমে লিখিত আবেদন করতে বলেন। পরে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
কয়েকদিন পর তিনি বলেন, ‘এটি ২০১৯ সালে শুরু হওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্প। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর কিছুদিন এ প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলাম। প্রকল্পটির অডিট সম্পন্ন হয়েছে এবং এটি শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে আমার বলার কিছু নেই। আমি কোনো তথ্য বা মন্তব্য দিতে পারব না। বিস্তারিত জানতে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’
ময়মনসিংহ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ওয়াহেদুল আলম বলেন, ‘প্রকল্পটি ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে অনিয়মের প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা তথ্য দিতে রাজি নন- এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রকল্প-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাই দিতে পারবেন। যেহেতু বিষয়টি তার উপজেলার, তাই প্রাথমিকভাবে তিনিই বিষয়টি দেখবেন।’