আমের রাজধানী খ্যাত উত্তরের জেলা নওগাঁ। প্রতিবারের মতো এ মৌসুমেও স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে এখানকার আম। তবে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আম পাকাতে ও সতেজ রাখতে ব্যবহার করছে ক্ষতিকর কেমিকেল। আবার, আমের পরিচর্যার নামে ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, জেলায় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আম বাগান রয়েছে। যা থেকে এবার প্রায় ৪ লাখ ২২ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলায় যে পরিমাণ আম বাগান রয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ আম্রপালি। এ বছর জেলায় ৩ হাজার কোটি টাকার আম বাণিজ্যের আশা কৃষি বিভাগের।
বরেন্দ্র এলাকা হওয়ায় এখানকার আম সুস্বাদু ও সুমিষ্ট। এ জেলার আমের কদর রয়েছে দেশজুড়ে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়ে থাকে। জেলার সাপাহার উপজেলা সদরে জিরো পয়েন্টে আমের বৃহৎ বাজার। উপজেলার থানার মোড় থেকে গোডাউন পাড়া পর্যন্ত প্রতিদিন প্রায় ২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসে আমের বাজার। বাজারে আম্রপালি, হাঁড়িভাঙ্গা, বারি-৪ ও ব্যানানা ম্যাংগো পাওয়া যাচ্ছে।
চাষিরা বাগান থেকে আম পেড়ে সকাল থেকে ভ্যান ও ভটভটিসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে এ বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন। প্রতিমন আম্রপালি প্রকারভেদে ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৮ হাজার টাকা, ব্যানানা ম্যাংগো ৭ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা, বারি-৪ আম ২ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৪ হাজার ৬০০ টাকা এবং ফজলি ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা মন দরে বিক্রি হচ্ছে।
সাপাহার উপজেলার বেশ কয়েকটি আম বাগান ও আড়ৎ ঘুরে দেখা যায়, আমের পরিচর্যার নামে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার, আড়তগুলোতে গোপনে ক্যারেট করার আগে আমে গোলাপি রংয়ের কেমিকেল স্প্রে করে প্যাকেটজাত করা হচ্ছে। এরপর ট্রাক যোগে চলে যাচ্ছে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়।
আম চাষিরা বলছেন, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলেও শেষ সময়ে এসে নিয়মিত বৃষ্টি হওয়ায় আমের রঙে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। অতিরিক্ত কীটনাশক দিয়েও কাজ হচ্ছে না। এতে বাড়ছে পরিচর্যায় ব্যয়। আমের রং খারাপ হওয়ায় কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে, লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। আবার, অসাধু ব্যবসায়ীরা আমে কেমিকেল স্প্রে করছে। এতে সাপাহার উপজেলায় আমের সুনাম নষ্ট হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে আম পাকানো একটি বেআইনি ও ক্ষতিকর পদ্ধতি। বাণিজ্যিকভাবে অনেকে আমের ক্যারেট বা বস্তায় কার্বাইডের ছোট প্যাকেট রেখে আর্দ্রতার সংস্পর্শে আনেন, যা অ্যাসিটিলিন গ্যাস তৈরি করে আম দ্রুত হলুদ করে। তবে, এটি আমের ভেতরের পুষ্টিগুণ নষ্ট করে এবং মানবদেহের জন্য মারাত্মক বিষাক্ত।
মিঠাপুকুর গ্রামের আমচাষী মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘৪ বিঘা জমিতে আম্রপালি ও বারি-৪ জাতের আম বাগান রয়েছে। এ বছর মৌসুমে শুরু থেকেই বৃষ্টি। এ কারণে আমে ময়লা জমে কালো এবং পোকামাকড়ের উপদ্রব হয়েছে । পরিষ্কার করার জন্য প্রতি সপ্তাহে ২ বার কীটনাশক স্প্রে করতে হয়। এতে কিছুটা হলেও কালো দাগ দূর হবে।’
সাপাহার উপজেলার ফুটকইল গ্রামের আমচাষী দুলাল হোসেন বলেন, ‘আমার ৪ বিঘাতে আম বাগান রয়েছে, যেখানে বিঘাপ্রতি পরিচর্যায় খরচ পড়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এ বছর ৩ লাখ টাকা বিক্রির আশা করেছিলাম। সেখানে প্রায় ২ লাখ টাকার মতো বিক্রি হয়েছে। আবহাওয়ার কারণে আমের কালার খারাপ হওয়ায় কিছুটা কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আম ব্যবসায়ী বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতে আম পাকাতে কেমিকেল কার্বাইড ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে আম যেহেতু পরিপক্ব হয়েছে, না পাকানোর জন্য অন্য একটি কেমিকেল ব্যবহার করা হয়। আম প্যাকেটজাত করে ট্রাকযোগে বিভিন্ন স্থানে পাঠানো, তারপর খুচরা ব্যবসায়ীর হাত ধরে ভোক্তার কাছে পৌঁছানে, এতে ৫-৬ দিন সময় লেগে যায়। এ সময়ের মধ্যে আম পচে নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তাই সতেজ রাখতে কেমিকেল স্প্রে করা হয়। এতে আম ধীরে পাঁকে।’
সাপাহার আড়ৎদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন রিফাত বলেন, ‘সাপাহার উপজেলায় প্রায় ৪ শতাধিক আমের আড়ৎ রয়েছে। এসব আড়ৎ থেকে আম স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৩০-৩৫ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। তবে, আমে মানব ক্ষতিকর কোনো কেমিকেল ব্যবহার হয় না।’
সাপাহার উপজেলা নির্বাহী অফিসার রোমানা রিয়াজ বলেন, ‘আড়তগুলোতে নিয়মিত তদারকি করা হয়। তবে, আমে কেমিকেল ব্যবহার করার কোনো বিষয় জানা নেই। যদি আড়তগুলোতে এ ধরনের কেমিকেল ব্যবহার করা হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
নওগাঁ জেলা সিভিল সার্জন কর্মকর্তা ডা. মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘খাদ্যপণ্যে যেকোনও ধরনের কেমিকেল মানব শরীরের জন্য বড় ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব বয়ে আনে। খাদ্যদ্রব্যে বিভিন্ন ভেজালের কারণে বাড়ছে ক্যান্সার। এছাড়া, কিডনি ও লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে অসুস্থের সংখ্যা। তবে, এ নিয়ে নিরাপদ খাদ্য বিভাগ কাজ করছে। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকেও সচেতন করা হচ্ছে।’
সময়ের আগে ফল না খাওয়ারও পরামর্শ দেন এ চিকিৎসক।
সময়ের আলো/মহু