জলাবদ্ধতায় লন্ডভন্ড কৃষি, সীতাকুণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার কৃষক

সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি

সারাদেশ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে টানা ৪ দিনের অতিবর্ষণ ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টি থেমে কয়েকদিন

2026-07-20T14:17:20+00:00
2026-07-20T14:19:04+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
জলাবদ্ধতায় লন্ডভন্ড কৃষি, সীতাকুণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার কৃষক
সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ২:১৭ পিএম  আপডেট: ২০.০৭.২০২৬ ২:১৯ পিএম
ক্ষতিগ্রস্ত খেত। ছবি : সময়ের আলো
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে টানা ৪ দিনের অতিবর্ষণ ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টি থেমে কয়েকদিন ধরে পানি নামতে শুরু করলেও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র। সরকারি হিসাবে তিনটি খাতে প্রায় ১৩ কোটি টাকার ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, মৎস্যচাষি ও খামারিদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকার কম নয়। দুর্যোগে অন্তত ২ হাজার কৃষক ও খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

উপজেলা কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দফতরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, কৃষি খাতে প্রায় ৮ কোটি, মৎস্য খাতে ৩ কোটি এবং প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি হিসাবের বাইরেও অনেক ক্ষয়ক্ষতি এখনো তালিকাভুক্ত হয়নি।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপজেলার সৈয়দপুর, বারৈয়ারঢালা, মুরাদপুর, বাড়বকুণ্ড, বাঁশবাড়িয়া, কুমিরা, ভাটিয়ারী ও সলিমপুর ইউনিয়ন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পশ্চিম পাশের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চলে কয়েকদিন ধরে পানি জমে থাকায় শত শত একর কৃষিজমি, মাছের ঘের, পুকুর এবং অসংখ্য খামার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় এখনো পানি নামেনি। পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ না থাকায় বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিয়েছে।


স্থানীয়দের অভিযোগ, সমুদ্র উপকূলীয় অধিকাংশ সুইসগেট অকার্যকর থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান খাল-নালা ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করায় জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে তাদের দাবি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১ হাজার ৬০০ হেক্টর ধানি জমির মধ্যে ১১২ হেক্টর এবং প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর সবজি আবাদি জমির মধ্যে ১৮০ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু ধান ও সবজি খাতেই প্রাথমিকভাবে প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে।

বাড়বকুণ্ডের কৃষক সফিউল আলম জানান, ৪০ শতক জমিতে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ঝিঙা চাষ করেছিলেন। ফলন বাজারে তোলার সময় জলাবদ্ধতায় পুরো খেত নষ্ট হয়ে যায়।

তিনি আরও জানান, পানি নেমে যাওয়ার পর ধান ও সবজির গাছ দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে।

তার ধারণা, পানির সঙ্গে কোনো দূষিত বা বিষাক্ত উপাদান মিশে থাকতে পারে। তবে, কৃষি বিভাগের কেউ এখনো মাঠে এসে খোঁজ নেননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।


মুরাদপুর এলাকার কৃষক মোহাম্মদ মহিউদ্দীন জানান, এক একর ৪০ শতক জমিতে প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয়ে লাউ ও চিচিঙ্গার আবাদ করেছিলেন। গুলিয়াখালী উপকূলীয় সুইসগেটের ছয়টি গেটের মধ্যে চারটি দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকায় পানি দ্রুত বের হতে পারেনি। এতে তার পাশাপাশি এলাকার প্রায় ৩০০ কৃষক বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।  

মৎস্য খাতেও ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ দশমিক ৩৪ হেক্টর আয়তনের ১৭৬টি পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানিতে প্রায় ১৩৬ দশমিক ৪৫ মেট্রিক টন মাছ ভেসে গেছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এছাড়া, পুকুরগুলোর অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকার।

মৎস্যচাষি দিপু জানান, ৩ বন্ধু মিলে বারৈয়ারঢালায় ছয়টি বড় পুকুর ও দিঘিতে মাছ চাষ করেছিলেন তারা। অতিবর্ষণে সবগুলো জলমগ্ন হয়ে যাওয়ায় প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে তাদের।

প্রাণিসম্পদ খাতেও জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে। উপজেলার প্রায় ১৬০ একর ঘাসের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সৈয়দপুর ইউনিয়নের খামারি সেলিম উদ্দিন জানান, তার খামারে ১ হাজার বাচ্চা মুরগি ছিল। পানি ঢুকে প্রায় ৫০০টি বাচ্চা মারা যাওয়ায় তার প্রায় ৪৫ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।

এদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় কাঁচাবাজারেও। সীতাকুণ্ড, ভাটিয়ারী, ফৌজদার হাট ও বাড়বকুণ্ড বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজির দাম কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।


উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কল্পনা রহমান বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হবে।’

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোতাসিম বিল্লাহ জানান, ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য চাষীদের তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে।

একইভাবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কল্লোল বড়ুয়া বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’

জলাবদ্ধতার কারণ সম্পর্কে সীতাকুণ্ড পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিমু মহাজন জানান, উপজেলার অধিকাংশ সুইসগেট ১৯৬২ সালে নির্মিত হওয়ায় বর্তমানে সেগুলোর বেশিরভাগই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। নতুন সুইসগেট নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলার খালগুলো পুনঃখনন করা গেলে ভবিষ্যতে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   জলাবদ্ধতা  লন্ডভন্ড  কৃষি  সীতাকুণ্ড  ক্ষতি  কৃষক  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: