সালটা ২০২২, কাতারের লুসাইল স্টেডিয়াম। যেখানে ৩৬ বছরের অপেক্ষা শেষে লিখেছিলেন এক অমর মহাকাব্যের রাত। ভেসেছিলেন আনন্দাশ্রুতে। চার বছরের ব্যবধানে বদলে গেল ভেন্যু, বদলে গেল প্রেক্ষাপট। কিন্তু আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনির চোখের জল থাকল অপরিবর্তিত। কারণ চোখের জলের তো রং নেই।
যে লুসাইলে সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরে সেদিন কেঁদেছিলেন আনন্দে, ২০২৬-এ মেটলাইফে সংবাদ সম্মেলনে সেই চোখেই দেখা গেল ফাইনাল হারের নির্মম বেদনা। সেই অমর মহাকাব্যের রূপকার এবার মেটলাইফ ট্র্যাজেডিতে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, আর সেই কান্নার তোড়েই মাঝপথে থমকে গেল তার সংবাদ সম্মেলন।
টানা দুইবার বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরার খুব কাছে চলে গিয়েছিলেন স্কালোনি। কিন্তু এবার আর সেই অভিজ্ঞতা মধুর হলো না। অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের ফেরান তোরেসের গোলেই ভেঙে যায় শিরোপার স্বপ্ন। আর্জেন্টিনাকে হতাশায় রেখে ১৬ বছর পর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। এই ফাইনাল হেরে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি আর্জেন্টাইন কোচ। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসে সাংবাদিকদের সামনে আই অ্যাম সরি বলেই কেঁদে ফেলেন তিনি। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও রেখে গেছেন এক অনিশ্চয়তা।
বিশ্বকাপের শিরোপা হারানোর বেদনার সঙ্গেও নিজের দলকে নিয়ে গর্ববোধ করেন স্কালোনি। স্পেনের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘খেলোয়াড়রা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মাঠের ভেতর নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে লড়েছেন। দেশের কোটি সমর্থককে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ফাইনালে একটি পরাজয় যেন টুর্নামেন্টজুড়ে দলের এত বড় অর্জনকে কোনোভাবেই ম্লান করে না দেয়।’
ম্যাচ শেষে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কোচ আরও বলেন, আমি কষ্ট পাচ্ছি। তবে এটাও জানি, ছেলেরা মাঠে নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছে। অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু এখন সেগুলো বলা সম্ভব নয়। এই দলটার প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ। তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে। সত্যি বলতে আজ স্পেনই ভালো খেলেছে। তবু এই দল যা করেছে তা নিয়ে আমার অসংখ্য গর্বের স্মৃতি থাকবে। এই পর্যায়ে পৌঁছানো কতটা কঠিন, আমরা তা ভালো করেই জানি।
ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে হেরে শিরোপা হারালেও তিনি কোনো অজুহাত খুঁজেননি। কোচের ভাষায়, আমরা যা অর্জন করেছি সেটার যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিত।
জয়ের সময় যেমন বড় হতে হয়, পরাজয়ের সময়ও তেমনি বড় হতে হয়। আজ আমরা দেখিয়েছি কীভাবে হার মেনে নিতে হয়। আমরা ম্যাচ হেরেছি এবং সেটি মেনে নিচ্ছি। কিন্তু তাই বলে এত দিন ধরে যা করেছি তা ভুলে যাওয়া যাবে না। দেশের সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি শুধু এটুকুই বলেছেন, দেশের মানুষের কাছে আমি শুধু বলতে চাই, আমরা মাঠে নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে লড়েছি।
গুরু দে লা ফুয়েন্তের বিপক্ষে শিরোপা হাতছাড়া করে ফুটবল বিশ্বে নতুন গুঞ্জন তৈরি করেছে তার এক মন্তব্য। আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে তিনি থাকবেন কি না এই নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করেছেন তিনি নিজেই। অশ্রুসিক্ত চোখে স্কালোনি জানান, চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চললেও কোচ হিসেবে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত তিনি নেননি।
এ সময় লিওনেল মেসির প্রসঙ্গ টেনে নিয়ে তিনি বলেন, লিওর (লিওনেল মেসি) সঙ্গে এখনও কথা হয়নি। আমার ক্ষেত্রে আমি সভাপতির সঙ্গে কথা বলব। আমি কী করতে চাই, সে বিষয়ে একটা ধারণা আছে। আপাতত চুক্তির মেয়াদ পূরণ করব, তারপর দেখা যাবে। সত্যি বলতে আমার কিছুটা সময় নিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। কারণ আমি জানি না এর চেয়েও বড় কিছু করতে পারব কি না। হয়তো আমাদের এ নিয়ে কথা বলতে হবে। এমন একটি সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি সভাপতির প্রতি কৃতজ্ঞ। এই দায়িত্বে থাকতে পারাটাই অনেক বড় ব্যাপার।
আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে স্কালোনির বর্তমান চুক্তির মেয়াদ আছে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তার সঙ্গে নতুন করে চুক্তি বাড়ানোর জন্য আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সভাপতি ক্লাদিও তাপিয়ার সঙ্গে বেশ কিছু দিন ধরেই আলোচনা চলছিল।
দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক বরাবরই ভালো থাকায় আলোচনাও চলছিল ইতিবাচকভাবে। কিন্তু বিশ্বকাপ ফাইনাল হারের পর স্কালোনির এই আবেগঘন মন্তব্যে ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত মিলছে। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত এখনই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না তিনি। আলবেসিলেস্তেদের ডাগআউটে তার থাকা বা না থাকার পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে চলতি বছরের শেষের দিকে।
সময়ের আলো/জেডি