আবারও রণক্ষেত্র ইরান : কোন পথে তেহরানের ভবিষ্যৎ?

লামিম ফাইহান উদয়

মতামত

ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য আবারও অস্থির সময় পার করছে। ১১ থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত টানা আট রাত ধরে তেহরানের আকাশে বিমান

2026-07-25T18:50:39+00:00
2026-07-25T18:52:17+00:00
 
  শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬,
১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
মতামত
আবারও রণক্ষেত্র ইরান : কোন পথে তেহরানের ভবিষ্যৎ?
লামিম ফাইহান উদয়
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ৬:৫০ পিএম  আপডেট: ২৫.০৭.২০২৬ ৬:৫২ পিএম
রণক্ষেত্র ইরান। ছবি : এআই
ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য আবারও অস্থির সময় পার করছে। ১১ থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত টানা আট রাত ধরে তেহরানের আকাশে বিমান হামলার সাইরেন বাজছে। ১১-১২ জুলাইয়ের রাতে এক দফাতেই মার্কিন বাহিনী ইরানের প্রায় ১৪০টি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়, যার জবাবে কুয়েত, ওমান, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে ইরানি পাল্টা হামলার খবর আসে। আইআরজিসি দাবি করে, তারা বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটিতে মার্কিন হেলিকপ্টার মেরামত কেন্দ্র, একটি পি-৮ পসেইডন বিমানের হ্যাঙ্গার ও ড্রোন কমান্ড সেন্টারে পাল্টা হামলা চালিয়েছে এবং তাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। ১৬ জুলাই জর্ডান তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে। একই সময়ে আইআরজিসি সিরিয়ার আল-তানফ ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার দাবি করে, যা যুক্তরাষ্ট্র অস্বীকার করেছে। আর ইরাকি কুর্দিস্তানে ইরানি হামলায় অন্তত ৮ জন নিহত হন। ১৭ জুলাই ইরানি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে সাম্প্রতিক এই হামলায় ইরানে অন্তত ৩৫ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।


এই যুদ্ধ অবশ্য শুরু হয়েছিল আরও আগে, ২৮ ফেব্রুয়ারিতে যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তেহরানে নিহত হন ৩৬ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, সঙ্গে তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য ও একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা। ৮ মার্চ তার পুত্র মোজতাবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মনোনীত করা হয়, কিন্তু আহত মোজতাবা মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত একবারও জনসম্মুখে আসেননি বা কণ্ঠস্বর শোনাননি, এমনকি বাবার ৪-৯ জুলাই অনুষ্ঠিত জানাজাতেও নয়। ফলে, এই পুরো সংকটের মূলে যে প্রশ্নচিহ্ন এখনো ঝুলে আছে, তা হলো ইরান আসলে কে চালাচ্ছে? রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ৩ জন ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে জানা যায়, হামলায় মোজতাবা খামেনির মুখ বিকৃত হয়ে গেছে এবং এক বা দুই পায়ে গুরুতর আঘাত লেগেছে, যদিও তিনি মানসিকভাবে সজাগ আছেন ও অডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে দাবি করা হয়। ইরানি কর্তৃপক্ষ অবশ্য আঘাতের মাত্রা লঘু করে দেখিয়েছে। তার প্রটোকল প্রধানের দাবি, নতুন নেতার শুধু গোড়ালিতে সামান্য চোট এবং কানের পেছনে ‘ছোট একটা ফাটল’ ছাড়া তিনি পুরোপুরি সুস্থ; যদিও মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে কৃত্রিম পায়ের ইঙ্গিত ও একাধিক অস্ত্রোপচারের কথা উঠে এসেছে। এদিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানও ক্রমশ কোণঠাসা, মে মাসে জানা যায় তিনি সর্বোচ্চ নেতার কাছে পদত্যাগের অনুমতি চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, যদিও তা গৃহীত হয়নি। ইরান পুরো বিষয়টিই অস্বীকার করে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সামাজিক মাধ্যমে এমন দাবিও ছড়ায় যে, আইআরজিসি তাকে গৃহবন্দি করেছে, যদিও এর সত্যতা এখনো কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করতে পারেনি।


সর্বোচ্চ নেতার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি আর প্রেসিডেন্টের ক্রমহ্রাসমান কর্তৃত্বের ফাঁকা জায়গাটা দখল করে নিচ্ছে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরানের সামরিক-অর্থনৈতিক-নিরাপত্তা কাঠামোর সর্বত্র গভীরভাবে ঢুকে থাকা এই বাহিনীই এখন প্রকৃত শক্তির কেন্দ্র; একজন সর্বোচ্চ নেতার অপসারণ বা অক্ষমতা মানেই শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন নয়। তবে আইআরজিসিও যে খুব নিরাপদ অবস্থানে আছে, তা নয়। ১৭ জুলাই মার্কিন বাহিনী চাবাহারের শহীদ কালান্তারি বন্দরের নজরদারি টাওয়ার ধ্বংস করে, যা দশকের পর দশক ধরে আইআরজিসি বাণিজ্যিক জাহাজ শনাক্ত ও লক্ষ্যবস্তু করতে ব্যবহার করত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন হামলায় আইআরজিসির অস্ত্রক্ষমতার প্রায় ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। অর্থাৎ ঘরের ভেতর ক্ষমতা কুক্ষিগত করে ফেললেও, বাইরের যুদ্ধক্ষেত্রে আইআরজিসি ক্রমশ চাপে পড়ছে, আর এই দ্বৈত বাস্তবতাই ইরানের ভেতরের অস্থিরতাকে আরও জটিল করে তুলছে।

এর মধ্যেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ইরানি সমাজের ভেতরকার গভীর বিভাজন। খামেনির মৃত্যুর পর দেখা গিয়েছিল তেহরানের রাস্তায় একদিকে হাজারো মানুষ শোকে জড়ো হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে ও প্রবাসী ইরানি সম্প্রদায়ের মধ্যে উদযাপনের দৃশ্যও পরিলক্ষিত হয়েছে। ৫ মাস পরও সেই বিভাজন মেটেনি, বরং যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট আর নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে সমাজ এখন আগের চেয়েও বেশি বিভক্ত। জনগণের এই বিভক্তি একদিকে যেমন শাসনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে, অন্যদিকে তেমনি প্রতিরোধের কোনো ঐক্যবদ্ধ শক্তি হয়ে উঠতেও বাধা দিচ্ছে।


একই সময়ে ইরানের আঞ্চলিক শক্তির ভিত্তি, তথাকথিত ‘এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ও ভেঙে পড়ছে। লেবানন এখন এই সংকটের অন্যতম স্পর্শকাতর অংশ। দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের ইরানি দাবির বিপরীতে নেতানিয়াহু সরকার নিরাপত্তার অজুহাতে সেখানে থাকার সিদ্ধান্তে অটল, আর গত পাঁচ মাসে সেখানে ৪ হাজার ২০০’র বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এই ক্রমাগত চাপে ইরানের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক মিত্র হিজবুল্লাহ ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে, আর তেহরানের হাতে থাকা আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ারগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছে।

এই পুরো পরিস্থিতিকে বোঝার একটা তাত্ত্বিক ফ্রেম দিতে পারেন কার্ল ভন ক্লজেউইটজ। তার বিখ্যাত ‘অন ওয়ার’ গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছিলেন, একটি রাষ্ট্র ৩টি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করে; জনগণ, সরকার ও সেনাবাহিনী। তার মতে, এই ত্রয়ীর মধ্যে সরকারই যুক্তি ও নীতির প্রতিনিধি হিসেবে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বের অধিকারী থাকা উচিত, যার অধীনে সেনাবাহিনী পরিচালিত হবে। সরকার যদি সেই নিয়ন্ত্রণ হারায়, তাহলে যুদ্ধ রাষ্ট্রের জন্য অনিয়ন্ত্রিত ও ধ্বংসাত্মক রূপ নেয়। ইরানের ভবিষ্যৎ এখন ঠিক সেই দিকেই মোড় নিচ্ছে বলে মনে হয়। সরকার কার্যত অনুপস্থিত এই সংকটকালে, আর তার ফাঁকেই আইআরজিসি নিজেকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে অথচ আইআরজিসি ইরানের প্রধান সামরিক বাহিনী নয়, বরং এটি দেশের নিয়মিত সেনাবাহিনীর সমান্তরালে পরিচালিত এক পৃথক কাঠামো। ক্লজেউইটজ ভাষায় বললে, সরকার-সেনা-জনগণের ত্রয়ী আজ ইরানে ভেঙে পড়ার মুখে, যেখানে না সরকার নিয়ন্ত্রণে আছে, না সেনাবাহিনী একক কাঠামোয়, না জনগণ ঐক্যবদ্ধ।


তবে শুধু কাগজে-কলমে এই দুর্বল অবস্থা দেখেই ইরানকে যুদ্ধে পরাজিত ধরে নেওয়া ভুল হবে। ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, সেখানে স্থল অভিযান চালানো অত্যন্ত কঠিন, যা যুক্তরাষ্ট্রও ভালোভাবে জানে। তাই এই যুদ্ধ শেষপর্যন্ত কতদিন চলবে, তা এখনো অনিশ্চিত। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই সবচেয়ে বড় আঘাত আসবে বিশ্ববাণিজ্যে। ইরান ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে কোনো জাহাজ ‘অবৈধভাবে’ পার হতে দেওয়া হবে না, আর ইউরোপীয় বিমান নিরাপত্তা সংস্থা অন্তত ২৯ জুলাই পর্যন্ত উপসাগরীয় আকাশপথ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নৌ-অবরোধ কার্যকর করেছে ইরানি বন্দরের বিপরীতে। সেই অবরোধের আওতায়ই খারগ দ্বীপের দিকে যাওয়া একটি খালি তেল ট্যাংকারকে অচল করে দেয় মার্কিন বাহিনী। এর প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারেও। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম একদিনেই প্রায় সাড়ে নয় শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা এপ্রিলের পর সবচেয়ে বড় একদিনের লাফ। মানুষের জীবনেও এর মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। হরমুজ প্রণালীর কাছে ওমান উপসাগরে আইআরজিসির হামলায় একটি জাহাজে কর্মরত ভারতীয় প্রকৌশলী নিহত হওয়ার পর ভারত সরকার এখন হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ভারতীয় নাবিক না পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি এটারই ইঙ্গিত দেয় যে, দুই পক্ষের কেউই আপাতত পিছু হটার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। ফেব্রুয়ারির প্রথম দফার হামলা যেখানে ইরানজুড়ে ছড়ানো এক ব্যাপক অভিযান ছিল, জুলাইয়ের এই নতুন দফা মূলত হরমুজ প্রণালী ঘিরে কেন্দ্রীভূত হলেও তা ক্রমশ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের রূপ নিচ্ছে।

খামেনির মৃত্যুর সময় ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ যতটা অনিশ্চিত ছিল, আজ পাঁচ মাস পরও ততটাই, বরং যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে এই সংঘাত কোথায় গিয়ে থামবে, তা কারও জানা নেই। প্রতিষ্ঠাতা প্রজন্মের সর্বশেষ প্রতীক নিহত, উত্তরসূরি অদৃশ্য, অর্থনীতি স্তিমিত, আঞ্চলিক মিত্ররা কোণঠাসা, আর সমাজ ও সরকারে বিভাজন এতই প্রকট যে দেশটি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে। প্রশ্ন থেকে যায় যে, এই সংকট কি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ৪ দশকের শাসনের সমাপ্তি ঘটাবে, নাকি আইআরজিসি নিয়ন্ত্রিত এক ভবিষ্যতে তা আরও কঠোরভাবে টিকে থাকবে?

লেখক : শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   রণক্ষেত্র  ইরান  তেহরান  ভবিষ্যৎ  যুক্তরাষ্ট্র  যুদ্ধ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: