অস্ট্রেলিয়া সফরের জন্য বাংলাদেশের ১৫ সদস্যের দল চূড়ান্ত করা সহজ ছিল না। সিরিজ শুরুর আগের কয়েক সপ্তাহে একের পর এক খেলোয়াড় চোটে পড়ায় বিষয়টি ‘চ্যালেঞ্জিং’ হয়ে উঠেছিল বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার। সাইড স্ট্রেইনে আক্রান্ত হয়ে সফর থেকেই ছিটকে গেছেন এক্সপ্রেস পেসার নাহিদ রানা। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট থেকে এখনও পুরোপুরি সেরে না ওঠায় প্রথম টেস্টে খেলতে পারবেন না শরীফুল ইসলামও। কাফের চোটে প্রথম টেস্টে নেই উইকেটকিপার-ব্যাটার লিটন দাসও।
এদিকে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পর হঠাৎ করেই টেস্ট দলে ফেরানো হয়েছে ভুলতে বসা সৌম্য সরকারকে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্টের দলে বাঁ-হাতি এই ওপেনারের অন্তর্ভুক্তি অনেককেই অবাক করেছে। তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার। তার মতে, অস্ট্রেলিয়ার দ্রুতগতির ও বাউন্সি উইকেটে বর্তমানে থাকা অন্য বিকল্পদের তুলনায় সৌম্য সরকারই বেশি প্রস্তুত। একই সঙ্গে দলে ডানহাতি ওপেনারের ঘাটতিও এই সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আগামী ১৩ আগস্ট ডারউইনে শুরু হবে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচ। সেই ম্যাচের দলেই জায়গা পেয়েছেন সৌম্য। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিরপুরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্ট খেলেছিলেন তিনি।
দল নির্বাচনের ব্যাখ্যায় হাবিবুল বাশার বলেন, আমরা অবশ্যই কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখেছিলাম। সৌম্যকে নেওয়ার সময়ও ভেবেছি, তা হলে ওপেনিংয়ে দুজন বাঁ-হাতি খেলতে পারে। এখন আমাদের টপ অর্ডারেই প্রায় পাঁচজন বাঁ-হাতি ব্যাটার আছে। যদি তানজিদ তামিম ও শাদমান ইসলাম ওপেন করে, তা হলে টানা চারজন বাঁ-হাতি ব্যাটার হয়ে যায়। এটা আদর্শ পরিস্থিতি নয়।
এ নিয়ে প্রধান নির্বাচক আরও বলেন, এই ভাবনা থেকেই মাহমুদুল হাসান জয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে ডানহাতি ওপেনার হিসেবে আমাদের কম্বিনেশনের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু জয়ের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স ও ব্যাটিং নিয়ে আমরা কিছুটা উদ্বিগ্ন। সে এখনও আমাদের পরিকল্পনায় আছে, কারণ ডানহাতি ওপেনার প্রয়োজন। তবে এখন তার ফর্ম ভালো নয়, ব্যাটিংও কিছুটা দূর্বল মনে হচ্ছে।
সৌম্যকে বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধান নির্বাচক বলেন, সৌম্য সরকার দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছে। অস্ট্রেলিয়ায় যে ধরনের গতি ও বাউন্স থাকবে, সে সেই পরিবেশে খেলতে অভ্যস্ত। আমরা অন্য ওপেনারদের কথাও ভেবেছি। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের ডানহাতি ওপেনাররা পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। যাদের নিয়ে কাজ করছি তারা একেবারেই নতুন। তাদের সরাসরি অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাওয়া কঠিন হতো। আমরা তাদের নিয়ে কাজ করছি। সামনে হাইপারফরম্যান্স দলের সিরিজ রয়েছে। আশা করি, আগামী এক বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় একজন ডানহাতি ওপেনার তৈরি করতে পারব।
উইকেটকিপার-ব্যাটার জাকের আলীর প্রত্যাবর্তন নিয়েও কথা বলেন বাশার। ইনজুরির কারণে প্রথম টেস্টে লিটন কুমার দাস না থাকায় দলে ফিরেছেন জাকের। শেষবার তিনি ২০২৫ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট খেলেছিলেন।
জাকেরকে নিয়ে প্রধান নির্বাচকের মন্তব্য, জাকের আলী টেস্ট খেলার সময় খারাপ খেলছিল না। তবে যখন সে দলের বাইরে যায়, তখন সে নিজের ফর্ম নিয়ে লড়ছিল। সামনে অনেক ম্যাচ থাকায় আমরা চেয়েছিলাম সে ঘরোয়া ও হাইপারফরম্যান্সের ম্যাচগুলো খেলে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাক। তখন তার মানসিক অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না, সে কিছুটা ভেঙে পড়েছিল।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হওয়া কিছু টুর্নামেন্টের পারফরম্যান্সের উল্লেখ করে হাবিবুল বাশার বলেন, আমরা তাকে যে দায়িত্ব দিয়েছিলাম, সে সেটি খুব ভালোভাবে পালন করেছে। প্রিমিয়ার লিগ ও হাইপারফরম্যান্সের ম্যাচে সুযোগ পেয়ে সে প্রমাণ করেছে যে সে প্রস্তুত। আনকন আমাদের ব্যাকআপ উইকেটকিপার ছিল, তবে জাকেরই সবসময় প্রথম পছন্দ।
লিটন দাসের চোট প্রসঙ্গে বাশার জানান, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডেতে লিটন চোট পেয়েছিল। তখন মনে হয়েছিল এটি কাফ মাসলের ছোটখাটো সমস্যা। সে টি-টোয়েন্টি দলেও ছিল। পরে আরেকটি স্ক্যানে গ্রেড-ওয়ান টিয়ার ধরা পড়ে। মেডিকেল দল জানিয়েছিল, তিন সপ্তাহের বেশি লাগবে না। কিন্তু সেই সময় পেরিয়ে গেলেও ব্যথা কমেনি।
শুধু লিটনের চোট নয়, নাহিদ রানার চোট নিয়েও বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সিরিজ থেকে নাহিদের ছিটকে পড়ার পর তার ওয়ার্কলোড ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ বিষয়ে সমালোচনা উড়িয়ে দিয়েছেন প্রধান নির্বাচক, ‘নাহিদ রানার ক্ষেত্রে আমরা সবসময় ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট অনুসরণ করি। এখন সবকিছুই জিপিএস ট্র্যাকার দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়। কে কত ম্যাচ খেলবে, কত ওভার করবে, কোন সিরিজে খেলবে, সবকিছুই নজরদারিতে থাকে।’
ওয়ার্কলোড ব্যবস্থাপনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাশার বলেন, ফাস্ট বোলারদের জন্য লাল, সবুজ ও হলুদ জোন থাকে। বেশি বল করলেও যেমন ঝুঁকি থাকে, কম বল করলেও ঝুঁকি থাকে। তাই পর্যাপ্ত ওভার করিয়ে তাকে ‘গ্রিন জোনে’ রাখতে হয়। একেবারেই না খেলিয়ে রাখাও একজন ফাস্ট বোলারের জন্য ভালো নয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি