কুস্তিতে বাংলাদেশের জনপ্রিয় এবং পরিচিত মুখ শিরিন সুলতানা। খেলোয়াড়ি জীবনে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে অসংখ্য পদক-সাফল্য বয়ে এনেছেন। সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ এখন জাতীয় দলে কোচের দায়িত্ব পালন করছেন।
শিরিন শুধু পুরুষ কুস্তি দলের কোচই নন, একই সঙ্গে বাংলাদেশ অ্যামেচার রেসলিং ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও। তার কোচিংয়ে সামনে এশিয়ান গেমসে অংশ নেবেন দুজন কুস্তিগীর। ৫৭ কেজি ওজন শ্রেণিতে মাহবুব আলম এবং ৬৫ কেজি ওজন শ্রেণিতে আব্দুস সাত্তার।
ময়মনসিংহের মেয়ে শিরিন একজন যোগ্য, দক্ষ কোচ হিসেবে ইতিমধ্যে সবার প্রশংসা কুড়িয়েছেন। সলিডারিটি কোচেস কোর্স লেভেল-২ সম্পন্ন করা সাবেক এ কুস্তিগীর মূলত গত বছর কোচিংয়ে এসে রীতিমতো আলোচনার ঝড় তোলেন।
জাতীয় নারী এবং পুরুষ দলকে অভিনব এবং আধুনিক পদ্ধতিতে ট্রেনিং করিয়ে সবার দৃষ্টি কাড়েন। এবার সেই শিরিনের অধীনেই জাপানের আইচি-নাগোয়া শহরে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া এশিয়ান গেমসে খেলবে সময়ের দুই সেরা কুস্তিগীর মাহবুব এবং সাত্তার। শিরিনের অধীনে মাসখানেক ধরে ট্রেনিংয়ে আছেন তারা। এমন একজন দক্ষ কোচ পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত ও গর্বিত খেলোয়াড়রা।
নারী হয়ে কেন পুরুষ দলের কোচ? এমন প্রশ্ন গত কিছু দিন ধরে বেশ শুনতে হচ্ছে শিরিনকে। অথচ গত বছর যখন শিরিন প্রথমবারের মতো নারী-পুরুষ উভয় দলের কোচের ভূমিকায় আসেন, তখন বোদ্ধা থেকে সাধারণ সবাই তার প্রশংসা করেছিলেন। অথচ বছর না ঘুরতে সেই শিরিন এখন প্রশ্নবাণে বিদ্ধ।
মনঃকষ্টে সময়ের আলোকে কুস্তির এই কোচ বলেন, ‘আমি কোনো জাতিকে ছোট করার উদ্দেশ্যে বলছি না। দেখুন আমি কিন্তু মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা নই, আমি এ দেশের সন্তান। আমি আপনাদের সামনে বেড়ে ওঠা একজন খেলোয়াড়। আজ হয়তো আমার ভূমিকায় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু আমি একদিনে এই জায়গায় আসিনি। ২০০৯ সালে কুস্তিতে আমার যাত্রা শুরু। সেখান থেকে ধাপে ধাপে আজ কোচ হয়েছি, ফেডারেশনের একটা দায়িত্বে আছি।’
জেন্ডার বৈষম্য মোটেও পছন্দ নয় শিরিনের। তার স্পষ্ট কথা পুরুষরা যদি সহযোগিতার হাত না বাড়িয়ে দেয়, তা হলে আমরা নারীরা কীভাবে এগিয়ে যাব। আর আমাকে নারী-পুরুষের কোটায় কেন ফেলছেন। আমি প্রথমে একজন অ্যাথলেট, তারপর কোচ— বলেন শিরিন।
এ বিষয়ে তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমার ভেতরে যদি যোগ্যতা থাকে, আমি যদি তাদের ট্রেনিং করাতে পারি, তা হলে আমি কেন দায়িত্ব পালন করব না? আমি সবাইকে বলব, যারা এই ধরনের সমালোচনা করেন, কথা বলেন— তারা আসুক, মাঠে এসে আমার ট্রেনিং দেখুক। ট্রেনিংয়ে যদি আমি নিজের উপযুক্ততার প্রমাণ দিতে না পারি, আমি নিজেই দায়িত্ব ছেড়ে চলে যাব।’
অভিমান পেছনে রেখে শিরিনের কাছে সরাসরি প্রশ্ন ছিল— এশিয়ান গেমসে আপনার প্রত্যাশা কী? আপনার দল কেমন করতে পারে? এর জবাবে কুস্তির কোচ জানান, ‘এশিয়ান গেমসের জন্য খুব বেশি দিন সময় পাইনি। এক-দেড় মাসের প্রস্তুতিতে অনেক বড় কিছু প্রত্যাশা করা ঠিক না। তবে আমি এতটুকু বলতে পারি আমরা প্লেয়ারদের ফিটনেস নিয়ে যথেষ্ট কাজ করেছি। যেহেতু ওদের জিম সুবিধা নেই, সুইমিংয়ের সুবিধা নেই; অপ্রতুল অবস্থাতেও মাহবুব-সাত্তার বেশ ভালোভাবে নিজেদের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বর্তমান সরকার ক্রীড়া উন্নয়নে যথেষ্ট কাজ করছে। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নিজে খেলোয়াড় ছিলেন। তার চেয়ে খেলোয়াড়দের জন্য দরদ অন্য কারও বেশি থাকার কথা নয়। আমিনুল হক স্যার সবকিছু দেখছেন। এশিয়ান গেমসে দল পদকের জন্য লড়বে; শেষ পর্যন্ত যদি পদক নাও আসে, তবে আমার ছেলেরা সেখানে ভালো ফাইট দেবে এটা আমার বিশ্বাস।’
কোচ শিরিনের সুরে সুর মিলিয়ে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন মাহবুব বলেন, ‘সত্যি বলতে একজন প্লেয়ারের ফিটনেস তৈরি হতেই লাগে তিন মাস। সেখানে আমরা পেয়েছি মাত্র দেড় মাস। অলওভার ফিটনেস, আপনি টেকনিক বলেন, গেমের জন্য প্রস্তুতি বলেন, নিজেকে প্রস্তুত করা, নিজের ওয়েট ঠিক রাখা, নিজের ডায়েট ঠিক রাখা— সবকিছু কন্ট্রোল করাটাই হচ্ছে দেড় মাসের ভেতরে। এত অল্প সময়ে আমরা ভালো কিছু প্রত্যাশা করতে পারছি না। বিশেষ করে মেডেলের ক্ষেত্রে।
তবে আল্লাহ যদি চান আমরা দেশবাসীকে ভালো গেম উপহার দিতে পারব। ১৮ কোটি মানুষের এই যে রক্তে ভেজা টাকা যা আমাদের পেছনে খরচ হচ্ছে, আমরা ভালো একটা গেম উপহার দিয়ে এই টাকার উসুল তোলার প্রাণপণ চেষ্টা করব। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’ মাহবুবের মতো একই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন আরেক কুস্তিগীর আব্দুস সাত্তারও।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে