শনিবার (১৮ জুলাই) রাতেও অনলাইন জুয়ায় হেরেছিলেন ভ্যানচালক জাবেদ আলী। বয়স ছিল ৫৫। পরদিন রোববার সকালে সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা ইউনিয়নের পূর্ব খামার দশলীয়া গ্রামে তার বাড়ি থেকে মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, ঋণের ভার আর সইতে পারছিলেন না তিনি।
সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাজউদ্দিন খন্দকার জানান, স্থানীয়দের কাছ থেকে তারা জেনেছেন, জাবেদ অনলাইনে জুয়া খেলতেন এবং তাতে অনেক ঋণ হয়েছিল। ভাগনি রাশেদা বেগম বলেন, শুরুতে মামা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিতেন, পরে এলাকার নানা মানুষের কাছ থেকে। ঋণ দাঁড়ায় পাঁচ লাখ টাকায়।
এলাকার মানুষ এই মৃত্যুকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করছেন না। সন্ধ্যার পর চায়ের দোকান, বাঁশঝাড়ের আড়াল, বন্ধ রেলস্টেশন বা পরিত্যক্ত ঘর কিংবা রাস্তার মোড়ে তরুণদের ভিড় দেখা যায়। সবার হাতে স্মার্টফোন, স্ক্রিনের আলোয় মুখ আলোকিত। তাসের বোর্ড আর ছক্কার কোটের জায়গা নিয়েছে বেটিং অ্যাপ ও অনলাইন ক্যাসিনো।
জুয়া এখন পকেটে
কয়েক দশক আগে জুয়া খেলতে নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে হতো। এখন লাগে একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, একটি অ্যাকাউন্ট আর একটি মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) ওয়ালেট। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংক্ষিপ্ত পথই অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। অ্যাপের পাশাপাশি ‘ফরডাবু-ছয়গুটি’ আর স্মার্টফোনে লুডুর নামেও বাজির আসর বসছে বলে জানা গেছে।
শহরতলির হাশেম বাজারের ব্যবসায়ী রঞ্জু মিয়ার গল্পটা এমনই। সংসার আর ব্যাবসা গুছিয়েই চলছিলেন। সঙ্গীদের পাল্লায় পড়ে মোবাইলে ৮০০ টাকা দিয়ে শুরু করেছিলেন অনলাইন বাজি। এখন প্রায় কোটি টাকা খুইয়ে পথে বসার দশা। বললেন, নেশা ধরে গেছে, টাকা তুলতে হবে, অথচ অবস্থা এখন নিঃস্ব। ব্যাপারীপাড়া গ্রামের রিয়াজুলকে জুয়া প্রাণে শেষ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা। তাদের ভাষ্য, সম্পদ বিক্রির টাকা নিয়ে সেই রাতেই সব হারিয়েছেন তিনি। এখন অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতে হচ্ছে তার স্ত্রীকে।
জুয়ার নগদ জোগান দিতে চড়া সুদের কারবারও ডালপালা মেলেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাদের ভাষ্য, এক লাখ টাকায় দিনে এক হাজার টাকা পর্যন্ত সুদ গুনতে হচ্ছে। সেই সুদ মেটাতে অনেক পরিবারকে বেচতে হচ্ছে বসতভিটা, গবাদিপশু, শেষ সম্বল। ক্ষতি তখন একজনের থাকে না, পুরো পরিবারের ঘাড়ে চাপে।
যাঁদের দিন বদলেছে
অনেকে নিঃস্ব হলেও ভাগ্য বদলেছে মাস্টার এজেন্ট, সাব এজেন্ট আর ডিলার পরিচয়ের কিছু মানুষের। স্থানীয়দের দাবি, সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা ও লোভই এই এজেন্টদের ওপরে ওঠার সিঁড়ি। ২২ আগস্ট সকালে সদরের তালুক মন্দুয়ার গ্রামে অভিযান চালিয়ে শুভজিত চন্দ্র সরকার ওরফে শিবুকে (৩০) ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় আটক করে পুলিশের জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তার কক্ষ থেকে দুটি ফোন, ই-পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, দুটি ব্লুটুথ স্পিকার ও নগদ ৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। অর্থের অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে গার্মেন্টসে কাজ নিয়েছিলেন তিনি। প্রতিবেশীরা বলছেন, আগে তাদের অবস্থা খারাপই ছিল, এখন কী করেন তা তারা জানতেন না। ঘটনাটি ভাইরাল হওয়ার পরই জানাজানি হয়।
ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মোত্তালিব সরকার জানান, শুভজিত জুয়া পরিচালনার কথা অস্বীকার করেছেন, যদিও তার কথাবার্তা ও আচরণে অসংগতি পাওয়া গেছে। জব্দ ফোনে প্রাথমিকভাবে জুয়ার আলামত মেলেনি। সন্দেহের কারণে সেগুলো ফরেনসিক পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে, প্রমাণ মিললে হবে নিয়মিত মামলা।
২৮ জুলাই খোলাহাটী দুলালের ভিটা গ্রাম থেকে আরিফুল ইসলাম আরিফ (৩২) ও সাগির আলমকে (৩১) গ্রেফতার করে ডিবি। পরদিন পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, তাদের কাছ থেকে দুটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন জব্দ হয়েছে। পুলিশের দাবি, ফোনে জুয়ার এজেন্ট অ্যাকাউন্ট ও নানা অ্যাপ পাওয়া গেছে। জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬-এর বিভিন্ন ধারায় সদর থানায় মামলা হয়েছে। এলাকায় তারা ‘অনলাইন ক্যাসিনোর সম্রাট’ নামে পরিচিত বলে পুলিশ জানিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আরিফ পোশাকশ্রমিক থেকে রাতারাতি কোটিপতি হয়েছেন। এই ঘটনায় আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ, যাঁরা ফোন নিয়ে পালিয়ে গেছেন। ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন গোবিন্দগঞ্জের সাগর পাশা।
গোবিন্দগঞ্জের শাখাহার ইউনিয়নের খারিতা গ্রামের আব্দুর রাজ্জাককেও (৩৫) ১৯ জুলাই রাতে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। থানার ওসি মোজাম্মেল হক জানান, তার মোবাইলে অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালনার অ্যাপের আলামত মিলেছে। তার বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বিজ্ঞাপন প্রচারেরও অভিযোগ আছে। পুলিশের দাবি, গ্রেফতারের সময় স্বজনেরা তাকে ছিনিয়ে নিতে হামলা করেন। পরদিন সোমবার তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
ডিবির দাবি, বিকাশের এজেন্ট নম্বর সচল রাখতে চক্রটি বিদেশি ডিভাইস ও ভিপিএন ব্যবহার করত এবং দূর থেকে ব্লুটুথের মাধ্যমে সেগুলো চালাত। এসব দাবি ফরেনসিক ফলের অপেক্ষায় আছে।
টাকা যায় কোথায়
তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের বর্ণনায় টাকার চলাচল মোটামুটি এমন। বিদেশি প্ল্যাটফর্ম প্রক্সি নেটওয়ার্কে জেলাভিত্তিক এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, এজেন্টরা স্থানীয় এমএফএস নম্বর চালান, আর জুয়াড়িরা নিজেদের ওয়ালেট থেকে সেই নম্বরে টাকা পাঠিয়ে বাজি ধরেন। বিদেশি বেটিং প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশে বৈধ ব্যাংকিং পথে লেনদেন করতে পারে না, তাই নির্ভর করে এমএফএস ওয়ালেট আর হুন্ডির ওপর।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কর্তৃক উন্মোচিত একটি আন্তর্জাতিক অনলাইন জুয়া-হুন্ডি চক্রের মামলার বিবরণী ও সূত্র অনুযায়ী, গাইবান্ধাকেন্দ্রিক এমন একটি চক্রের সন্ধান মিলেছে। রাশিয়ায় থাকা বাংলাদেশি নাগরিক মতিউর রহমান ও তার দল আন্তর্জাতিক জুয়ার সাইটের এজেন্টশিপ নেন। এমএফএস নম্বর দরকার হলে সহায়তা নেন গাইবান্ধার সৈকত রহমানের। অভিযোগ, সৈকত ও তার সহযোগীরা ভুয়া তথ্যে সিম ও এমএফএস এজেন্ট অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করে জুয়ার টাকা লেনদেন করেন। সেই টাকা আঞ্চলিক ওয়ালেট থেকে হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে, বিশেষ করে ইউএসডিটিতে রূপান্তর করে বিদেশে পাঠানো হয়।
বাংলাদেশ ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তথ্য বলছে, একটি জুয়ার অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত ৫১টি এমএফএস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এক বছরে প্রায় ১১২ কোটি ২৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা পাচারের একটি হিসাবও প্রচলিত আছে। তবে আসক্তের সংখ্যা ও লেনদেনের অঙ্ক নিয়ে যে-সব বড় সংখ্যা ঘোরে, বিশ্লেষকেরা সেগুলোকে নিশ্চিত তথ্য না ধরতে বলছেন। তাদের মতে, নীতি ঠিক করতে দরকার নির্ভরযোগ্য জাতীয় জরিপ। গাইবান্ধার দেশ আইটির পরিচালক শাহাদত হোসেন শহিদের ভাষ্য, এই টাকা পুরোটাই দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি।
অভিযান থেকে নতুন আইন
সমস্যাটি যে গ্রামের আড্ডার গণ্ডি ছাড়িয়েছে, তার আভাস আগেই মিলেছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক অনলাইন জুয়া শনাক্তে ধারাবাহিক নজরদারির নির্দেশ দেয়। ২৭ মে সিআইডি সারা দেশে অভিযান শুরু করে এবং জানায়, এক হাজারের বেশি এমএফএস এজেন্টের জুয়ার লেনদেনে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। সরকারি হিসাবে জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে প্রায় ৫৫ হাজার এমএফএস অ্যাকাউন্টের লেনদেন স্থগিত বা ফ্রিজ করা হয়েছে। ওই বছরের অক্টোবরে প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট জুয়া ও বেটিংয়ের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করে।
এরপর এল নতুন আইন। ৩০ জুন ২০২৬ সংসদে জুয়া প্রতিরোধ বিল পাস হয়, উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। বাতিল হয় ১৮৬৭ সালের পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, নতুন আইন কার্যকর হয় ১ জুলাই থেকে। অনলাইন ও রিমোট গ্যাম্বলিং, বেটিং, ম্যাচ-ফিক্সিংসহ ২৪টি কার্যক্রমের সংজ্ঞা এসেছে আইনে। সাধারণ জুয়ায় সর্বোচ্চ সাজা দুই বছর বা দুই লাখ টাকা জরিমানা, অনলাইন বেটিংয়ে অংশ নিলে সাত বছর ও পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত। ভুয়া সিম, এমএফএস অ্যাকাউন্ট বা ক্রিপ্টো ব্যবহার করে সংগঠিত জুয়া ও অর্থপাচারে সাজা দশ বছর পর্যন্ত। আইন কার্যকরের পর ঢাকার পল্টন থানায় মামলা করে সিআইডি একটি চক্রের চারজনকে গ্রেফতার করেছে।
গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফ আল রাজীব বলেন, জেলা গোয়েন্দা শাখাসহ থানাগুলোর অভিযানী দল প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে জড়িতদের আইনের আওতায় আনছে।
ক্ষমতা ও স্বাধীনতার টানাপড়েন
অনলাইন জুয়া বন্ধের ক্ষমতা আর ইন্টারনেট সেন্সরশিপের ক্ষমতা এক নয়। জুয়ার অভিযোগে ওয়েবসাইট ব্লক করা বৈধ ও প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্ত কে নেবে, কী প্রমাণে, কতদিনের জন্য, ভুল ব্লক হলে প্রতিকার কী, এসব প্রশ্নের উত্তর দরকার। সংসদেও এই উদ্বেগ উঠেছিল। কয়েকজন সংসদ সদস্য আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়া তল্লাশি, আলামত জব্দ ও ওয়েবসাইট ব্লকের ক্ষমতা নিয়ে সুরক্ষা ব্যবস্থার কথা বলেন। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন সদস্য বিলটি পর্যালোচনা কমিটিতে পাঠানোর অনুরোধ করেছিলেন, কণ্ঠভোটে তা নাকচ হয়।
ব্লক করলেই সমস্যা মেটে না, বলছেন বিশ্লেষকেরা। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট মঈনুর রহমান সোহেল মনে করিয়ে দেন, ভিপিএন আর হোয়াটসঅ্যাপ-টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম দিয়ে ঢোকার পথ থেকেই যায়। তার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আর্থিক গেটওয়েগুলো ঠিকঠাক নজরদারিতে রাখা। তাই নীতি হতে হবে বহুস্তরীয়। আঘাত হানতে হবে নেটওয়ার্ক, এজেন্ট ও অর্থের উৎসে, কারণ আসক্ত সাধারণ ব্যবহারকারী আর সিন্ডিকেট এক নয়। আসক্তদের জন্য চাই কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন। প্রয়োগ হতে হবে প্রমাণনির্ভর, ফরেনসিক ফলের আগে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
প্রশ্নটি বদলে গেছে
অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ হবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর নতুন আইনে মিলেছে। এখন প্রশ্ন, এমন একটি ব্যবস্থা কীভাবে গড়া যায় যা একই সঙ্গে কার্যকর, সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল এবং রাজনৈতিকভাবে জবাবদিহিমূলক।
দশলীয়া গ্রামে জাবেদ আলীর পরিবারের কাঁধে এখন পাঁচ লাখ টাকার ঋণ আর একটি শূন্য ঘর। রিয়াজুলের স্ত্রী অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার টানছেন। রঞ্জু মিয়া টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় আছেন। কঠোরতা যাবে অপরাধী অপারেটর ও জুয়ার আর্থিক জালের বিরুদ্ধে, সুরক্ষা পাবে তরুণ ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষ, সহায়তা পাবেন আসক্তরা। রাষ্ট্রের সেন্সরশিপ-ক্ষমতারও থাকতে হবে স্পষ্ট সীমা। এসব প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে, অনলাইন জুয়াবিরোধী নীতি সাময়িক অভিযান হয়ে থাকবে, নাকি প্রমাণভিত্তিক ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক নীতিতে রূপ নেবে।
সময়ের আলো/জোই