বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক অস্ট্রেলীয় নারীর রহস্যজনক মৃত্যুর তদন্ত প্রভাবিত করার এবং বাংলাদেশ পুলিশের নথি থেকে নিজের নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করার অভিযোগে ৫১ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ (এএফপি)।
অভিযোগ, ওই ব্যক্তি বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের ঘুস দিতে প্রায় ৯০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার পাঠিয়েছেন। এ অর্থের মাধ্যমে তদন্তের গতিপথ নিজের অনুকূলে নেওয়া এবং বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তসংক্রান্ত নথি থেকে নিজের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে এএফপি।
এএফপির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত স্বার্থে বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুস দিয়ে ফৌজদারি তদন্তের গতিপথ পরিবর্তনের অভিযোগে অস্ট্রেলিয়ায় এটাই প্রথম মামলা।
গ্রেফতার ব্যক্তি কুইন্সল্যান্ডের রেডব্যাংক প্লেইনসের বাসিন্দা এবং নিহত নারীর পূর্বপরিচিত। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) তাকে ব্রিসবেন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে।
নিখোঁজের পর বাংলাদেশে মরদেহ উদ্ধার
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। ওই সময় কুইন্সল্যান্ড পুলিশ সার্ভিস (কিউপিএস) এএফপিকে জানায়, অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা এক নারী বাংলাদেশে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন।
পরে বাংলাদেশ পুলিশ অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষকে জানায়, বাংলাদেশে ওই নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষায় তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক নয় বলে নিশ্চিত হওয়ার পর ঘটনাটিকে সন্দেহজনক মৃত্যু হিসেবে তদন্ত শুরু করে বাংলাদেশ পুলিশ।
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিমিনাল কোডের ১১৫ ধারার আওতায় বিদেশে অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের হত্যা, অপমৃত্যু বা গুরুতর ক্ষতির ঘটনায় তদন্তের এখতিয়ার রয়েছে এএফপির। এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি এএফপিও আলাদাভাবে অনুসন্ধান শুরু করে।
বাংলাদেশে পাঠানো হয় ৯০ হাজার ডলার
এএফপির তদন্তে অভিযোগ ওঠে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই ব্যক্তি বাংলাদেশে প্রায় ৯০ হাজার অস্ট্রেলীয় ডলার পাঠিয়েছেন। এসব অর্থ বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুস দেওয়ার কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্য ছিল বলে অভিযোগ করেছে অস্ট্রেলীয় পুলিশ।
এএফপির দাবি, তদন্ত প্রভাবিত করা এবং বাংলাদেশ পুলিশের তদন্তসংক্রান্ত নথি ও রেকর্ড থেকে নিজের নাম বাদ দেওয়ার লক্ষ্যেই ওই অর্থ পাঠানো হয়।
তদন্তের অংশ হিসেবে সিডনি ও ব্রিসবেনের একাধিক আর্থিক ও ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালায় এএফপি। সেখান থেকে আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের নথি, ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের তথ্য জব্দ করা হয়।
দুই বছর তদন্তের পর সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) কুইন্সল্যান্ডের গুডনা ও রেডব্যাংক প্লেইনস এলাকার দুটি আবাসিক ভবনে অভিযান চালিয়ে ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাঁর কাছ থেকে একাধিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করা হয়েছে। এসব ডিভাইস ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার ফৌজদারি আইনের ৭০.২ (১) ধারায় বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুস দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
এএফপি জানিয়েছে, বিদেশি কর্মকর্তাকে ঘুস দিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের অভিযোগে এটি সংস্থাটির ইতিহাসে প্রথম মামলা।
এএফপির কমান্ডার স্টিফেন জয় বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় কিংবা বিদেশে—কোনো বিচারিক বা তদন্ত প্রক্রিয়াকে দুর্নীতিগ্রস্ত করার চেষ্টা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। বিশেষ করে গুরুতর কোনো অপরাধের তদন্তের ফল পরিবর্তনের চেষ্টা হলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।
তিনি বলেন, অর্থের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ বা তদন্তের গতিপথ বদলানোর চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে।
স্টিফেন জয় আরও বলেন, এএফপি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
তবে অস্ট্রেলীয় পুলিশ জানিয়েছে, ঘুসের অভিযোগে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারীর রহস্যজনক মৃত্যুর মূল তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে।
সময়ের আলো/এসএকে