ইয়েমেনে হুতিদের দ্রুত অগ্রযাত্রার মুখে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার সাধারণ মানুষকে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে হুতিদের ছেড়ে সরকারি বাহিনীতে যোগ দেওয়া যোদ্ধাদের জন্য সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি। তার এই ঘোষণাকে হুতিদের অগ্রগতি ঠেকিয়ে আবারও দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার নতুন প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হুতিদের হাতে পশ্চিম ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ রেড সি উপকূলের বড় অংশ চলে যাওয়ার পর প্রথম ভাষণে আল-আলিমি দেশবাসীকে ‘সাধারণ ও জাতীয় সমাবেশে’ যুক্ত হয়ে সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুতিরা রেড সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ শহর মোখা দখল করেছে এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়িয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি রেড সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে ইয়েমেনের এই নতুন লড়াই এখন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বিষয় নয়; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের সঙ্গেও এর যোগ তৈরি হয়েছে।
কেন এখন এই ডাক?
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর অবস্থান সাম্প্রতিক সময়ে দুর্বল হয়েছে। মোখা ও আশপাশের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে তাদের পিছু হটতে হয়েছে। সরকারপন্থী বাহিনী তায়েজ ও মারিবসহ কয়েকটি ফ্রন্টে লড়াই চালিয়ে গেলেও হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। আলজাজিরার ইয়েমেনবিষয়ক সম্পাদক আহমেদ আল-শালাফি আল-আলিমির বক্তব্যকে কার্যত একটি ‘যুদ্ধের ভাষণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ। হুতিদের সামরিক তৎপরতা এখন নিয়মিতভাবে সৌদি ভূখণ্ডকেও লক্ষ্যবস্তু করছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সৌদি কর্তৃপক্ষ তায়েফ ও ইয়ানবুর দিকে ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে। ফলে রিয়াদও নতুন করে ইয়েমেনের সংঘাতের গভীরে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
হুতিদের যোদ্ধাদের সাধারণ ক্ষমা কেন?
সাধারণ মানুষকে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আহ্বানের পাশাপাশি আল-আলিমি হুতিদের সঙ্গে থাকা যোদ্ধাদেরও সরকারি বাহিনীতে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। শুক্রবার দেওয়া ঘোষণায় তিনি বলেন, যারা হুতি বাহিনী ছেড়ে সরকারি বাহিনীতে যোগ দেবে, তাদের জন্য অবিলম্বে সাধারণ ক্ষমা কার্যকর হবে। তবে এই ক্ষমা সংবিধান ও আইন অনুযায়ী প্রক্রিয়ার মধ্যেই দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে বিপুলসংখ্যক হুতি যোদ্ধা পক্ষ বদল করবেন—এমন সম্ভাবনা কম। তবে সংঘাতের পাল্লা বদলাতে শুরু করলে সাধারণ ক্ষমার প্রস্তাবটি হুতিদের ভেতরে ভাঙন তৈরির একটি উপায় হতে পারে। অর্থাৎ, সরকারি পক্ষ শুধু নতুন যোদ্ধা সংগ্রহ করতে চাইছে না; একই সঙ্গে হুতিদের শক্তির ভেতর থেকেও লোক টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
সৌদি আরব এবার কী করবে?
রিয়াদের সামনে এখন কঠিন সমীকরণ। হুতিরা বাব আল-মান্দাবের আশপাশে নিজেদের অবস্থান শক্ত করলে সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূল এবং লোহিত সাগর দিয়ে তেল রফতানির ওপর ঝুঁকি বাড়তে পারে। হরমুজ প্রণালিতে চলাচল বাধাগ্রস্ত থাকার বর্তমান পরিস্থিতিতে পশ্চিম উপকূল দিয়ে জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বও বেড়েছে।
এ কারণেই সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের সাম্প্রতিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে সামরিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু করেছে। তিন দেশের সামরিক প্রধানেরা শুক্রবার প্রথমবার বৈঠক করেছেন। তবে ইয়েমেনে সরাসরি সেনা পাঠানো হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব অতীতে ব্যাপক বিমান হামলার ওপর বেশি নির্ভর করলেও স্থলযুদ্ধে বড় আকারে সৈন্য নামানোর বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক থেকেছে। তুরস্ক ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও সরাসরি যুদ্ধের বদলে কারিগরি সহায়তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আল-আলিমির ফোনালাপ হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, আল-আলিমি সরাসরি সামরিক সহায়তা চাইলেও ট্রাম্প এ বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।
ঝুঁকিতে বৈশ্বিক বাণিজ্য
বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় ইয়েমেনের এই সংঘাতের প্রভাব দেশটির সীমানার বাইরেও পড়তে পারে। ইয়েমেন সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ আবদুলকাদের আল-আলিমি-বাওজার জাতিসংঘে বলেছেন, নৌ চলাচলের নিরাপত্তাকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
জাতিসংঘের হিসাবে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর ইয়েমেনে ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসার চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে।
ফলে আল-আলিমির সাধারণ সমাবেশের ডাক কেবল নতুন করে যুদ্ধে জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজধানী সানা পুনর্দখলের লক্ষ্য, হুতিদের ভেতরে বিভাজন তৈরির চেষ্টা, সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং বাব আল-মান্দাব দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল সচল রাখার প্রশ্ন। ইয়েমেনের সাম্প্রতিক যুদ্ধ এখন আবারও আঞ্চলিক সংঘাতের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠছে।
সময়ের আলো/জেডি