যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন বৈঠক জাঁকজমক ও সৌজন্যে পূর্ণ হলেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে বিশ্লেষকদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে রয়টার্স।
গত সপ্তাহের এই শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশ প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের কিছু অ-সংবেদনশীল পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছালেও তা বাস্তবায়নের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি। একই সঙ্গে বৃহত্তর বাণিজ্য চুক্তির সময়সীমাও আগামী বছর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
চীনের জন্য ‘পিআর জয়’
বৈঠকে ট্রাম্প শি জিনপিংকে বিশেষ মর্যাদা দেন। ১১ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে স্বাগত জানাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজে বিমানবন্দরে উপস্থিত হন। পরে হোয়াইট হাউসের রাষ্ট্রীয় ভোজেও ট্রাম্প শির সঙ্গে সম্পর্কের প্রশংসা করেন।
বিশ্লেষক জো মাজুরের মতে, বৈঠকটি চীনের জন্য একটি ‘পিআর জয়’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তার মতে, বৈঠকে ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হলেও দুই দেশের মৌলিক মতপার্থক্য কমেনি।
চীনের সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা শেন ওয়েইঝং বলেন, চীনের দৃষ্টিতে বৈঠক নিজেই গুরুত্বপূর্ণ, প্রতিবার শীর্ষ বৈঠক থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক চুক্তি বা শুল্ক কমানোর ফল পাওয়া জরুরি নয়।
কৃষিপণ্যে কিছু সুবিধা পেল যুক্তরাষ্ট্র
তবে ট্রাম্পও কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে ফিরেছেন। চীন যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টা, দুগ্ধজাত পণ্যসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র চীনের খেলনা, আতশবাজি ও ক্রিসমাস অলংকারসহ কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক কমাবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য সয়াবিন চীনের প্রস্তাবিত তালিকায় না থাকায় মার্কিন কৃষকদের জন্য অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
তাইওয়ান ইস্যুতে মতপার্থক্য
তাইওয়ান ইস্যুতেও বড় কোনো সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে, আর যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্প এবার প্রকাশ্যে তাইওয়ানের কাছে প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি তোলেননি। মে মাসের বৈঠকে তিনি ওই অস্ত্রচুক্তিকে চীনের সঙ্গে আলোচনার একটি “দর-কষাকষির হাতিয়ার” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
বিশ্লেষক জেরেমি চ্যানের মতে, শি-ট্রাম্পের ঘন ঘন বৈঠক চীনকে তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সম্ভাব্য পদক্ষেপ বিলম্বিত করার সুযোগ দিতে পারে।
‘পরিচালিত অচলাবস্থা’
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের চীন এস. রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ড্রু থম্পসনও মনে করেন, বৈঠকটি দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করলেও পারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্রেইগ সিঙ্গেলটনের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক এখন একটি ‘পরিচালিত অচলাবস্থায়’ রয়েছে। তার মতে, বৈঠকের আয়োজন যতটা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল, বাস্তব অগ্রগতি ছিল তার তুলনায় সীমিত।
সিঙ্গাপুরের এস. রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ড্রু থম্পসনও মনে করেন, বৈঠকটি দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করলেও পারস্পরিক সন্দেহ ও মৌলিক মতপার্থক্য কমাতে পারেনি।
এদিকে চীনের বিরল মাটি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ওপর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে দেশটির অবস্থান বেইজিংকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব দিচ্ছে।
সার্বিকভাবে, ট্রাম্প-শি বৈঠকে উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক বার্তা থাকলেও বাণিজ্য, তাইওয়ান ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার মতো প্রধান ইস্যুতে দুই দেশের দূরত্ব বহাল রয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ