আগামী মাসের নির্বাচনে ক্ষমতা ধরে রাখতে আবারও দীর্ঘদিনের পরিচিত নির্বাচনী কৌশল নিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বৈরী পরিবেশে ইসরায়েলকে নিরাপদ রাখতে তিনিই সবচেয়ে সক্ষম— প্রচারণায় এমন একটি ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন তিনি।
তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলার পর নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধাক্কা খেয়েছে। ওই হামলায় ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থার ভয়াবহ ব্যর্থতা প্রকাশ পায়।
২৭ অক্টোবরের নির্বাচনটি হবে ৭ অক্টোবরের হামলার পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন। হামাসের ওই হামলাকে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ নিরাপত্তা ব্যর্থতাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়।
নেতানিয়াহুর ডানপন্থি দল লিকুদের এবারের নির্বাচনী স্লোগান, নেতানিয়াহু আত্মসমর্পণ করেন না। তবে অধিকাংশ জনমত জরিপে দলটি পার্লামেন্টে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসন হারাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচনী বক্তৃতা ও প্রচার ভিডিওতে নেতানিয়াহু তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বল বামপন্থি হিসেবে তুলে ধরছেন। তার দাবি, তারা ইসরায়েলের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর মতো দৃঢ় অবস্থান নিতে এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে দেশের পক্ষে দাঁড়াতে সক্ষম নয়।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ইয়োহানান প্লেসনার বলেন, ২০২৩ সালের হামলার পর নেতানিয়াহুর জন্য এবারই প্রথম এমন নির্বাচন, যেখানে তার নিজের সরকারের নিরাপত্তা ব্যর্থতা সরাসরি নির্বাচনী ইস্যু হয়ে উঠেছে। তার ভাষায়, এটি অনেকটা নেতানিয়াহু ও তার সরকারের দায়িত্ব এবং হামলার পর যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে একটি গণভোটের মতো।
যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক চাপকে প্রচারণার কেন্দ্রে রাখছেন
হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া বহুমুখী যুদ্ধে ইসরায়েল হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিকভাবে কিছু সাফল্য পেলেও কৌশলগতভাবে খুব বেশি অর্জন করতে পারেনি— এমন বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে রয়টার্স।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস হওয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেশটি ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহু বক্তব্য দেওয়ার সময় বহু দেশের প্রতিনিধি হল থেকে বেরিয়ে যান।
যুক্তরাষ্ট্রসহ ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের মধ্যেও দেশটির প্রতি সমর্থন কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৯ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর ছবি বিলবোর্ডে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছিল লিকুদ। এবার দলের প্রচার ভিডিওতে ট্রাম্পের উপস্থিতি নেই।
তবে নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক সমালোচনার জবাবে আগের মতোই কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন। জাতিসংঘে তার সাম্প্রতিক বক্তব্যের ভিডিও ও বিভিন্ন অংশ নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে ব্যাপকভাবে প্রচার করেছেন তিনি। একটি ভিডিওতে তিনি বলেন, বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েলের পক্ষে লড়াই করতে তিনি গর্বিত।
আরব দলগুলোকে ঘিরে পুরোনো প্রচারণা
নেতানিয়াহুর প্রচারণার আরেকটি পরিচিত কৌশল হলো— তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা জয়ী হলে আরব সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠন করবে এবং ফিলিস্তিন ইস্যু ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তারা নরম অবস্থান নেবে— এমন বার্তা দেওয়া।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট। তিনি একটি নতুন মধ্যপন্থী দল ইয়াশারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গাজায় সামরিক দায়িত্ব পালনের সময় আইজেনকোটের ছেলে নিহত হন।
লিকুদের সাম্প্রতিক প্রচারণায় আইজেনকোটকে আরব দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে দেখিয়ে একাধিক পোস্ট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি প্রকাশ করা হয়েছে।
১৮ সেপ্টেম্বরের এক প্রচার ভিডিওতে নেতানিয়াহু বলেন, আপনি কি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র চান, নাকি ইহুদি রাষ্ট্র?
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোৎস আসা-এল মনে করেন, আইজেনকোটের সামরিক পটভূমি এবং তার দলের মধ্য-ডানপন্থি অবস্থানের কারণে নেতানিয়াহুর পুরোনো কৌশল এবার কতটা কার্যকর হবে, তা অনিশ্চিত।
সরকার গঠনে অচলাবস্থার সম্ভাবনা
ইসরায়েলের নির্বাচন জরিপ অতীতে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু সম্ভবত এমন একটি ফলাফল সম্পর্কে সচেতন, যেখানে তার পক্ষে এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা কঠিন হতে পারে।
শালোম হার্টম্যান ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসা-এলের মতে, নেতানিয়াহুর কৌশল হতে পারে এমন পর্যাপ্ত আসন নিশ্চিত করা, যাতে তার বিরোধীরা বিকল্প সরকার গঠন করতে না পারে। এর ফলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হলে তিনি অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থেকে আরেকটি নির্বাচনের দিকে যেতে পারেন।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ