সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে ইরানের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক জবাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ইরানি কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। তবে মার্কিন জবাবে কী বলা হয়েছে কিংবা ওয়াশিংটন প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মার্কিন জবাব প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কাছে তুলে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা এ তথ্য প্রকাশ করেছে। খবর এপির।
পেজেশকিয়ান বলেছেন, চুক্তি বাস্তবায়নে ইরান সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে এবং দেশের জনগণের অধিকার রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নেবে। তাঁর মতে, যেকোনো চুক্তি হতে হবে ‘উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক’ কৌশলের ভিত্তিতে।
গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফর করেন আরাগচি। দেশে ফেরার পর মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি সফরকালে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বৈঠক ও আলোচনার বিষয়ে বিস্তারিত জানান। নিউইয়র্কে ইরানি কর্মকর্তারা মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনা করেন। পাশাপাশি কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গেও বৈঠক করেন তারা।
হরমুজ প্রণালি খুলতে শর্ত
মন্ত্রিসভার বৈঠকে আরাগচি হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের শর্তগুলো তুলে ধরেন। মোহাজেরানি জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এসব শর্ত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো হয়েছে।
আরাগচি গত সপ্তাহে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিলে, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছেড়ে দিলে এবং ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ আরও কয়েকটি শর্ত মেনে নিলে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান।
তবে ইরানের এই প্রস্তাব প্রকাশ্যেই প্রত্যাখ্যান করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরান ‘ভীষণ বাজেভাবে হেরে যাচ্ছে’ বলেই সমঝোতায় যেতে চাইছে। তবে তেহরানের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয় বলেও জানান তিনি।
ট্রাম্পের প্রকাশ্য প্রত্যাখ্যানের পরও যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর লক্ষ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি না থাকায় তারা নাম প্রকাশ করেননি।
তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন
যুদ্ধ বন্ধে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা যখন অনিশ্চিত, তখন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানসহ বিভিন্ন দেশে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইরানের সামরিক সরবরাহব্যবস্থায় অর্থায়ন বা সহযোগিতা করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের তথাকথিত ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর অংশ হিসেবে এসব নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য ইরান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক পথগুলো বন্ধ করা। ইরান, হংকং ও পাকিস্তানে থাকা ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য অস্ত্র ও অস্ত্রের যন্ত্রাংশ সংগ্রহের অভিযোগ আনা হয়েছে।
আরও চাপে ইরানের অর্থনীতি
যুদ্ধ শুরুর আগেই নানা সংকটে থাকা ইরানের অর্থনীতি সংঘাত শুরুর পর আরও চাপে পড়েছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশটির মুদ্রার দর ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
মঙ্গলবার তেহরানের বাজারে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ২৫ লাখের বেশি ইরানি রিয়ালে লেনদেন হয়েছে। এটি রিয়ালের নতুন রেকর্ড দরপতন। এর মাত্র ২৭ দিন আগে, ২ সেপ্টেম্বর, এক ডলারের বিপরীতে ২২ লাখ রিয়ালে নেমেছিল দেশটির মুদ্রার মূল্য।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানি রিয়াল বারবার নতুন সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে সংঘাতের কারণে দেশটির অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবার ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ‘খুব খারাপভাবে ব্যর্থ হচ্ছে’। একই সঙ্গে তিনি আবারও বলেন, যুদ্ধ ‘খুব, খুব শিগগিরই’ শেষ হয়ে যাবে। যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, সংঘাত কয়েক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হবে না। পরে অবশ্য তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ শেষ হবে না।
দুই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
এদিকে জানুয়ারির দেশব্যাপী সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে বুধবার ইরানে দুই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা এ তথ্য জানিয়েছে।
দেশটির বিচার বিভাগের বরাত দিয়ে ইরনা জানায়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে সংঘটিত সহিংসতায় ওই দুই ব্যক্তি অংশ নিয়েছিলেন। ওই ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর চার সদস্য নিহত হন। পরে ইরানের সুপ্রিম কোর্ট তাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে এবং বুধবার সকালে তা কার্যকর করা হয়।
দেশটির মুদ্রার দরপতন ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতিকে কেন্দ্র করে গত ২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। পরে তা দ্রুত দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সরকার উৎখাতের দাবিও তোলে। জবাবে ইরানি কর্তৃপক্ষ ব্যাপক দমন-পীড়ন চালায়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ওই বিক্ষোভে হাজারো মানুষ নিহত এবং কয়েক দশক হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত নিহতের সংখ্যা এর তুলনায় অনেক কম।
সব মিলিয়ে যুদ্ধ অবসানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা নতুন করে গতি পেলেও সমঝোতার পথ এখনো অনিশ্চিত। একদিকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে তেহরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে ওয়াশিংটন। এর পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ইরানের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ