জাপানে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেতে বিদেশিদের জন্য নতুন শর্ত চালু করেছে দেশটির সরকার। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) থেকে কার্যকর হওয়া এসব নিয়মে, জাপানি ভাষাজ্ঞান, পেনশনসহ দেশটির সামাজিক নিয়মকানুন সম্পর্কে আবেদনকারীর ধারণাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থায়ী আবাসিক মর্যাদার আবেদন ফি ২০ গুণ বাড়ানো হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, জাপানে স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদনকারীদের বার্ষিক আয় সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনুযায়ী জাপানি পরিবারের গড় আয়ের নির্ধারিত মাত্রা ছাড়িয়েছে—এমন প্রমাণ দিতে হবে। পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবন ও সমাজে স্বাভাবিকভাবে চলার জন্য প্রয়োজনীয় জাপানি ভাষাজ্ঞান থাকতে হবে। সরকারি নির্দেশনায় জাপানি ভাষার ক্ষেত্রে ‘বি-১’ সমমানের দক্ষতাকে বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া আবেদনকারীর জাপানের সামাজিক নিয়ম ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বোঝাপড়া, পেনশনসহ সরকারি দায়বদ্ধতা পালনের বিষয়ও বিবেচনা করা হবে। নতুন নিয়মে এমন পেনশন সুবিধার যোগ্যতার বিষয়ও দেখা হবে, যা ৩০ বছর ধরে পেনশন বিমার চাঁদা দেওয়া একজন ব্যক্তির সমতুল্য।
স্থায়ী বসবাসের আবেদনের ফিও ১ অক্টোবর থেকে ১০ হাজার ইয়েন থেকে বেড়ে ২ লাখ ইয়েন হয়েছে। অর্থাৎ আগের তুলনায় ফি বেড়েছে ২০ গুণ। তবে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যেসব আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে অনুমোদন ১ অক্টোবরের পর হলেও পুরোনো ফিই প্রযোজ্য হবে।
ফি বাড়ার আগে আবেদন শেষ করতে বুধবার টোকিওর কেন্দ্রীয় একটি অভিবাসন দপ্তরে শত শত মানুষকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁদের একজন যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ইউজি চোনো। ২২ বছর বয়সী এই শিক্ষার্থী জানান, কাগজপত্র জমা দিতে তাঁকে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।
জাপানে এক দশক ধরে বসবাস করা চোনো বলেন, অতিরিক্ত বিদেশি গ্রহণের ফলে জাপানের নিজস্ব সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তিনি বুঝতে পারেন। তবে একই সঙ্গে কম জন্মহার ও দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা জনসংখ্যার কারণে জাপানের বিদেশিদেরও প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
এর আগে জাপানে স্থায়ী বসবাসের ক্ষেত্রে আয়, পেনশন বা ভাষাজ্ঞানের নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারিত ছিল না। নতুন ব্যবস্থায় এসব বিষয়কে স্থায়ী আবাসিক মর্যাদা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনার আওতায় আনা হয়েছে।
জাপানে জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে। বিভিন্ন খাতেও শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যেই অভিবাসন নিয়ে দেশটিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সরকার বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তাকাইচি বলেন, জাপানে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু নাগরিকের মধ্যে উদ্বেগ ও বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হচ্ছে। বিদেশিদের সঙ্গে ‘সুশৃঙ্খল সহাবস্থান’ নিশ্চিত করতে তিনি নতুন পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলেও জানান।
আন্তর্জাতিক কর্মীদের জাপানে আকৃষ্ট করতে নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েও দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিবাসনবিরোধী মনোভাবের পাশাপাশি বিদেশিদের নিয়ে বিভিন্ন মিথ্যা দাবিও ছড়াচ্ছে। এর মধ্যে বিদেশিরা জাপানের কল্যাণ ভাতার বড় অংশ নিয়ে যাচ্ছে এবং তাঁদের কারণে দেশটির রাস্তাঘাট অনিরাপদ হয়ে উঠছে—এমন দাবিও রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞ ও অনেক ব্যবসায়ী নেতা মনে করেন, অর্থনীতি ও সমাজের ভবিষ্যৎ ধরে রাখতে জাপানকে আরও বিদেশি কর্মী গ্রহণ করতে হবে। ব্যবসাভিত্তিক দৈনিক নিক্কেই এক সাম্প্রতিক সম্পাদকীয়তে বিদেশিদের শুধু অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদে জাপানে বসবাসের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে। পাশাপাশি জাপানি ভাষা শেখার সুযোগ বাড়ানো এবং বিদেশিদের সঙ্গে আচরণ উন্নত করার আহ্বান জানিয়েছে পত্রিকাটি।
অভিবাসন নিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক বিতর্ক
গত বছরের উচ্চকক্ষের নির্বাচনে বিদেশি ও অভিবাসন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠে। ওই নির্বাচনে ‘জাপানিজ ফার্স্ট’ বা ‘জাপান আগে’ অবস্থানকে সামনে রাখা সানসেইতো দলের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। দলটি অভিবাসনকে ‘নীরব আগ্রাসন’ হিসেবে বর্ণনা করে।
এর আগে গত বছর ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিও ব্যবসা পরিচালনার ভিসার নিয়ম কঠোর করার উদ্যোগ নেয়। নতুন শর্ত পূরণ করতে না পারলে বিদেশি উদ্যোক্তাদের জাপান ছাড়তে হতে পারে।
অনেক বিদেশি জাপানে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি চান দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, চাকরির ক্ষেত্রে স্বাধীনতা এবং সমাজে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য। স্থায়ী আবাসিক মর্যাদা না থাকলে বাড়ি কেনার জন্য ঋণ বা মর্টগেজ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়তে হয়।
তবে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাউকে জাপান থেকে বের করে দেওয়া হবে না। এর ফলে মূলত কিছু বিদেশি স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন না-ও করতে পারেন।
জাপানে দীর্ঘদিন বসবাস করা চোনো বলেন, অভিবাসন নিয়ে বিতর্কের দুই দিকই তিনি বোঝেন। তবে দেশের ভবিষ্যৎ ধরে রাখতে তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন রয়েছে।
তার ভাষায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বাড়ানোর জোরালো উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল। এখন সেই গতি কিছুটা থেমে গেছে এবং হয়তো তা আর আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরবে না।
সময়ের আলো/এসএকে