ক্ষতিগ্রস্ত এক কৃষক ও পাহাড়ি ঢলে নষ্ট হওয়া সবজির খেত। ছবি : সময়ের আলো
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরে পাহাড়ি ঢলের পানিতে আগাম শীতকালীন সবজি নষ্ট হয়ে দুই শতাধিক কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এতে প্রায় ১০০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হওয়ায় প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে কয়েক কোটি টাকা, যা ঋণগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ভয়াবহ চাপ তৈরি করেছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, সবজি বাজারে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আশিষ চন্দ্র দাশ। ৬ একর জমিতে পেঁপে, শসা, বেগুন, মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, আলু ও মরিচসহ বিভিন্ন আগাম শীতকালীন সবজি চাষ করেছিলেন তিনি। লক্ষ্য- মৌসুমের শুরুতেই সবজি বিক্রি করে ভালো দাম পাওয়া। চাষাবাদে নিজের অর্থের পাশাপাশি ব্র্যাক থেকে ৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন আশিষ। সব মিলিয়ে তার বিনিয়োগ প্রায় ৯ লাখ টাকা। কিন্তু ফসল বিক্রির আগেই আকষ্মিক পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে তার অধিকাংশ আবাদ। মাসের পর মাসের শ্রম ও বিনিয়োগ এখন পানির সঙ্গে মেশে গেছে।
পাহাড়ি ঢলে নষ্ট হওয়া সবজির খেত। ছবি : সময়ের আলো
আশিষ বলেন, ‘এ পর্যন্ত ১ লাখ টাকার সবজি বিক্রি করতে পেরেছি। এরমধ্যে পাহাড়ি ঢলে অধিকাংশ খেত নষ্ট হয়ে গেছে। এখন ৫ লাখ টাকার ঋণ কীভাবে শোধ করব, এটাই বড় চিন্তা।’
আশিষের মতো একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন কাঞ্চননগরের আরও দুই শতাধিক কৃষক। তাদের কেউ সঞ্চয়ের টাকা, কেউ বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে আগাম সবজি চাষ করেছিলেন। ফসল বিক্রি করে লাভ করার বদলে এখন তাদের ক্ষতির মুখে পড়তে হলো।
কাঞ্চননগরের হলিপাড়া এলাকার কৃষক মোহাম্মদ সুমন ও মুরশেদ আলম লালশাক, লাউ ও মিষ্টিকুমড়া চাষ করেছিলেন। পাহাড়ি ঢলে তাদের আবাদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাল্লানপাড়া চরের কৃষক মো. রফিক আগাম সবজি চাষের জন্য এনজিও থেকে ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এক একরে চাষ করেছিলেন। ধুরুং খালের চরে তার জমিগুলো পাহাড়ি ঢলের স্রোতে ভেঙে ও তলিয়ে যায়। এতে প্রায় আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়।
কৃষক মকবুল আহমেদ ১ একর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষ করেছিলেন। ঢলের পানিতে তার আবাদি জমিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিরাজুল হক, মো. কাসেম, শংকর দাশ, স্বপন দাশ ও সুজিতসহ আরও অনেক কৃষক এবার আগাম সবজি চাষে অর্থ ও ঋণ বিনিয়োগ করেছিলেন। তাদের কারও ঋণ ৩০ হাজার, কারও ৪০ বা ৫০ হাজার, আবার কারও ২ লাখ টাকা পর্যন্ত।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মঙ্গল-বুধবারের আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে কাঞ্চননগরের মানিকপুর থেকে কাঞ্চননগরহাট পর্যন্ত ধুরুং খালের দুপাড়ের চরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যতদূর চোখ যায় শুধু পলি ও ধু-ধু বালুচরে সবজির আবাদগুলো নষ্ট হয়ে একাকার হয়ে গেছে। কোথাও পলি ও বালু-মাটিতে একাকার হয়ে গেছে। চাপা পড়া সবজি গাছগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছে বিরানভূমিতে পরিণহ হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক বলেন, ‘গত দুদিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে এসব অঞ্চলের প্রায় ১০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোথাও কোথাও আগাম সবজি ও বিক্রয় উপযোগী ফসল বালির নিচে চাপা পড়েছে। অনেক জমিতে ২ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত পলি ও বালি জমেছে। প্রাথমিক হিসাবে অন্তত কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তাদের সহায়তা ও প্রণোদনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মুহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’