ভারতের বেঙ্গালুরুতে লিভ-ইন সঙ্গীর বাবা-মা ও বোনকে হত্যার ঘটনায় ২৫ বছর বয়সী প্রযুক্তিবিদ জে কেনেথের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, হত্যাকাণ্ডের আগে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মানুষকে আক্রমণের বিভিন্ন পদ্ধতি জানতে চেয়েছিলেন।
বেঙ্গালুরুর কেআর পুরম এলাকার সীঘেহাল্লিতে গত ২২ জুন সংঘটিত ওই ট্রিপল মার্ডারের তদন্তে কেনেথের ল্যাপটপ থেকে এসব তথ্য উদ্ধার করা হয়। আদালতে দাখিল করা ২ হাজার ৮৫ পৃষ্ঠার চার্জশিটে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ১৮।
পুলিশের দাবি, কেনেথ এআইয়ের কাছে রান্নাঘরের ছুরি দিয়ে মানুষকে কীভাবে আক্রমণ করা যায়, ভিনেগার ও লঙ্কার গুঁড়ো ব্যবহার করে কাউকে কীভাবে অন্ধ করা যায়, তিনজনের হাঁটু কীভাবে ভেঙে দেওয়া যায় এবং একই সঙ্গে তিনজনকে কীভাবে কাবু করা যায়— এ ধরনের বিভিন্ন বিষয়ে অনুসন্ধান করেছিলেন।
এ ছাড়া মানুষ হত্যায় ব্যবহৃত কয়েকটি প্রাণঘাতী অস্ত্র সম্পর্কেও তিনি তথ্য খুঁজেছিলেন। একই সময়ে এক বন্ধুর ঋণের কারণে ব্যাংক থেকে আসা ফোন কীভাবে সামলানো যায় এবং দেউলিয়া ঘোষণার প্রক্রিয়া নিয়েও তিনি অনলাইনে অনুসন্ধান করেন।
তদন্তকারীদের কাছে এসব সার্চ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ হত্যাকাণ্ডের আগে এসব অনুসন্ধান করা হয়েছিল। পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, কেনেথ নিয়মিত এআইয়ের সঙ্গে কথোপকথন করতেন এবং সেটিকে অনেকটা বন্ধুর মতো ব্যবহার করতেন বলে তদন্তে ধারণা পাওয়া গেছে। তবে এআই তার প্রশ্নগুলোর কী উত্তর দিয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ফরেনসিক পরীক্ষার সময় তার ল্যাপটপে গুগলের ড্রপডাউন সার্চ অপশনে থাকা প্রশ্নগুলোর সূত্র ধরে তদন্তকারীরা এসব তথ্য পান।
ঘটনাস্থলে ভিনেগার-লঙ্কার মিশ্রণ
হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকেও তদন্তকারীরা ভিনেগার ও লঙ্কার গুঁড়ো মেশানো একটি বোতল উদ্ধার করেছেন। হোয়াইটফিল্ড ডিভিশনের ডিসিপি সৈদুলু আদাভাত জানিয়েছেন, বোতলটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
অর্থনৈতিক চাপ থেকেই বিরোধ
চার্জশিট অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ ছিল মূলত অর্থনৈতিক চাপ ও কেনেথের কারণে তার লিভ-ইন সঙ্গী শ্বেতার ওপর তৈরি হওয়া চাপ।
শ্বেতাও একজন প্রযুক্তিবিদ। পুলিশের দাবি, এক বছরের মধ্যে কেনেথকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতে তিনি প্রায় ৫২ লাখ রুপি ঋণ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৩০ লাখ রুপির ব্যবসায়িক ঋণ, দুটি ব্যাংক থেকে ৮ লাখ ও ৬ লাখ রুপির ব্যক্তিগত ঋণ এবং বন্ধু, আত্মীয়, সহপাঠী ও সহকর্মীদের কাছ থেকে ধার করা আরও ৮ লাখ রুপি ছিল।
ঋণের কিস্তি পরিশোধ না হওয়ায় ব্যবসায়িক ঋণ দেওয়া ব্যাংক থেকে শ্বেতার বাবা-মায়ের বাড়িতে নোটিশ পাঠানো হয়। এরপর তারা জানতে পারেন, মেয়ে কেনেথকে সহায়তা করতে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছেন।
এ নিয়ে শ্বেতার সঙ্গে তার বাবা-মায়ের বিরোধ তৈরি হয়। পরে তার বাবা সোমসুন্দর (৫৫) কেনেথের কাছে ঋণের টাকা এবং পরিবারের কাছে পাঠানো ব্যাংকের নোটিশের বিষয়ে জানতে চান।
২২ জুনের রাতে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড
পুলিশের অভিযোগ, ২২ জুন রাতে সীঘেহাল্লির সাই গ্রিন অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের একটি ফ্ল্যাটে ওই বিরোধ ভয়াবহ রূপ নেয়। সেখানে শ্বেতার বাবা সোমসুন্দর, মা মুথুলক্ষ্মী (৫০) এবং ছোট বোন সুপ্রিয়া (২০)-কে কেনেথ হামলা করেন বলে অভিযোগ।
একাধিক আঘাত পাওয়ার পরও সোমসুন্দর কোনোভাবে সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছে নিরাপত্তাকর্মী ও আশপাশের লোকজনকে জানান যে কেনেথ তার স্ত্রী ও মেয়েকে আক্রমণ করছেন। পরে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
মুথুলক্ষ্মী ও সুপ্রিয়ার শরীরেও একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। পরে তারাও মারা যান।
চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে শ্বেতা দাবি করেছেন, কেনেথ তার বাবা-মা ও বোনকে আক্রমণ করার সময় তিনি ঘটনাটি নিজের চোখে দেখেছিলেন।
ঘটনার তদন্তে এখন কেনেথের এআই অনুসন্ধান, আর্থিক লেনদেন, হত্যার আগে তার কর্মকাণ্ড এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামত—সবকিছুই গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ