মা ইলিশ রক্ষায় প্রজনন মৌসুমে সরকারি ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেই সমুদ্র ও মেঘনা নদী থেকে ঘাটে ফিরতে শুরু করেছেন ভোলার মনপুরার হাজার হাজার জেলে। তবে ইলিশ সংরক্ষণে সরকারের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে ঘাটে ফিরলেও সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে— তা নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন উপজেলার অধিকাংশ জেলে পরিবার। একদিকে মহাজনের দাদনের টাকা পরিশোধের চাপ, অন্যদিকে এনজিওর কিস্তির বোঝা মনপুরার মাছের ঘাটগুলোতে ফিরে আসা জেলেদের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ ফেলে দিয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে মেঘনা নদীর নির্ধারিত এলাকাসহ সারা দেশে ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে। এই নিষেধাজ্ঞা আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। প্রজনন মৌসুমে ইলিশসহ সব ধরনের মাছকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতে এই সময়ে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
উপজেলার রামনেওয়াজ, হাজিরহাট, জনতা বাজার, উত্তর সাকুচিয়া ও দক্ষিণ সাকুচিয়ার বিভিন্ন মাছের ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, জেলেরা তাদের ট্রলার ও নৌকা তীরে এনে নোঙর করছেন। নদী ও সাগর থেকে আনা জাল গুটিয়ে পাড়ে তোলার কাজ চলছে পুরোদমে। কিন্তু কাজ চললেও জেলেদের অন্তরে চেপে বসেছে অজানা আর্থিক সংকট ও সংসার চালানোর চিন্তা।
স্থানীয় জেলেদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমের শুরু থেকেই নদীতে কাঙ্ক্ষিত মাছের দেখা পাননি তারা। জ্বালানি তেল, খাদ্যসামগ্রী ও জাল-ট্রলার মেরামতের চড়া খরচের যোগান দিতে গিয়ে অধিকাংশ জেলেই মহাজন ও আড়তদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের দাদন নিয়েছিলেন। মৌসুমের শেষের দিকে কিছুটা মাছ পাওয়ার আশা থাকলেও সরকারি বিধিনিষেধের কারণে এখন খালি হাতেই ঘাটে ফিরতে হচ্ছে তাদের।
রামনেওয়াজ ঘাটের জেলে মো. জলিল বলেন, নদীতে নামলে যে পরিমাণ খরচ হয়, মাছ পেয়ে সেই খরচই উঠছে না। তার ওপর ৭ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ শিকার বন্ধ। এই সময়ে এনজিওর কিস্তিওয়ালাদের চাপ কীভাবে সামলাব, সেই চিন্তায় রাতে ঘুম আসছে না। সরকার চাল দেয় ঠিকই, কিন্তু শুধু চাল দিয়ে তো আর সংসার ও অন্যান্য খরচ চলে না।
উপজেলা মৎস্য দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মনপুরা উপজেলায় মোট নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ১৬ হাজার ৪০০ জন। তবে এর মধ্যে সরকারি সহায়তার আওতায় নিষেধাজ্ঞাকালীন ১১ হাজার ৫০০ জন জেলের মাঝে খাদ্য সহায়তার চাল বিতরণ করা হবে।
নিবন্ধিত ১৬ হাজার ৪০০ জন জেলের বিপরীতে মাত্র ১১ হাজার ৫০০ জনের জন্য চাল বরাদ্দ থাকায় বাকি জেলেদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তার ওপর চাল বিতরণে অনিয়ম, বরাদ্দ অনুযায়ী ৮০ কেজির স্থানে ৪০ কেজি প্রদান এবং প্রকৃত জেলেদের বাদ পড়ার অভিযোগে চরম বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন নদী-সাগরে বেঁচে থাকা প্রকৃত জেলেরা।
দক্ষিণ সাকুচিয়ার এক জেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নিবন্ধনের বাইরে অনেক প্রকৃত জেলে রয়ে গেছেন। এতে করে তারা সরকারের কোনো সহায়তা পান না। প্রকৃত জেলেদের বাদ দিয়ে নিবন্ধনের দোহাই দিয়ে অপেশাদার লোকজনকে চাল দেওয়া হয়, প্রকৃত জেলেরা চাল পাই না। তাছাড়া সরকার জেলেদের সহায়তার জন্য ৮০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দিলেও আমরা হাতঘুরে পাই মাত্র ৪০ কেজি।
উপজেলার সাধারণ জেলেরা সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছেন, যেন এই ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময়ে এনজিওর কিস্তি আদায় সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়, প্রকৃত জেলেদের নাম নিবন্ধনের আওতায় আনা হয় এবং চাল বিতরণের অনিয়ম দূর করে বরাদ্দকৃত চাল সঠিকভাবে জেলেদের হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।
উপজেলা ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির সহসভাপতি আক্তার হোসেন বলেন, মনপুরায় অনেক ভুয়া নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। এসব ভুয়া নাম অবিলম্বে বাদ দিয়ে নদী-সাগরে বেঁচে থাকা প্রকৃত জেলেদের কার্ডের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
উপজেলা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা কাজল রেখা জানান, মা ইলিশ রক্ষা অভিযান সফল করতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ঘাটে সচেতনতামূলক সভা ও মাইকিং করা হয়েছে। সরকারের নির্দেশ অমান্য করে কেউ নদীতে মাছ ধরতে নামলে কিংবা মাছ পরিবহন ও বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সাথে বরাদ্দকৃত ১১ হাজার ৫০০ জন নিবন্ধিত জেলের মাঝে চাল পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে এবং যেকোনো ধরনের অনিয়ম রোধে প্রশাসন সচেষ্ট রয়েছে বলে জানান তিনি।
সময়ের আলো/আতা