শিক্ষা খাতে বাজেট ঘাটতি, শিক্ষক ও কর্মী সংকট এবং জরাজীর্ণ স্কুল ভবনের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ফরাসি সরকার এই আন্দোলনকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে সহিংস ছাত্র বিক্ষোভ হিসেবে বর্ণনা করেছে। রাজধানী প্যারিসের একটি হাইস্কুলে শিক্ষকদের সমর্থনে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন জাতীয় পর্যায়ের বিক্ষোভে পরিণত হয়েছে।
ক্লাস বর্জন করে দেশটির বিভিন্ন শহরের হাইস্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবক ও ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যরাও আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। বিক্ষোভ দমনে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার এবং ব্যাপক গ্রেফতার করায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করেছে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের ৮৭ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। আন্দোলনের অন্যতম প্রধান আয়োজক মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন জানিয়েছে, ফ্রান্সজুড়ে প্রায় দুই হাজার হাইস্কুল বন্ধ রয়েছে। ইউনিয়ন সিঁদিকাল লিসেয়েন (ইউএসএল) জানিয়েছে, দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও আন্দোলন সংগঠিত করা হয়েছে।
মঙ্গলবারের বিক্ষোভকে ‘কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে সহিংস ছাত্র বিক্ষোভ’ বলে মন্তব্য করেছেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান লেকর্নু। রয়টার্স জানিয়েছে, রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকরাও বিক্ষোভে অংশ নেন। প্যারিস, স্ত্রাসবুর, রেন ও তুলুজসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীরা সহিংস হয়ে উঠলে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, মঙ্গলবার বিভিন্ন শহরের মিছিলে আড়াই লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন। তবে আন্দোলনের আয়োজকদের দাবি, শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভকারীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখে পৌঁছেছিল। ইউএসএল জানিয়েছে, ওই দিন প্রায় দুই হাজার হাইস্কুল অবরুদ্ধ বা বন্ধ ছিল।
প্যারিস থেকে আলজাজিরার প্রতিনিধি জানান, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও রাজনৈতিক মতের মানুষ অংশ নিচ্ছেন। কৃষক ইউনিয়ন, জ্বালানি শ্রমিক ও শিক্ষক সংগঠনগুলোও শিক্ষার্থীদের সমর্থনে রাস্তায় নেমেছে। অভিভাবক ও শিক্ষকদের ভাষ্য, তারা একদিকে সন্তানদের সমর্থন করছেন, অন্যদিকে ‘অনুপ্রবেশ করে উপদ্রব সৃষ্টিকারীদের’ পাশাপাশি পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ থেকেও সন্তানদের রক্ষা করতে চাইছেন।
প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, রাজধানীতে প্রায় ৩০০ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। তাদের বেশির ভাগই মুখোশ পরা ছিলেন। অন্যান্য শহরে বিক্ষোভের সময় কয়েকটি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বড় ধরনের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার ৪৮৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় ৪৮ জন নিরাপত্তা সদস্য আহত হন। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু ফ্রান্সের হাইস্কুলগুলোর ক্লাস সপ্তাহের বাকি সময়ের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছেন। পার্লামেন্টে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সংঘর্ষে অন্তত ২১৫ কিশোর ও ৮৫ স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘স্কুল ব্যবস্থায় কয়েক দশকের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় ক্ষতি।’
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে, সহিংসতায় ৭০০-এর বেশি পুলিশ কর্মকর্তাও আহত হয়েছেন।
এদিকে আসন্ন বসন্তে ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে দেশটিতে চরম ডান ও চরম বামপন্থি দলগুলোর প্রতি সমর্থন বাড়ছে। এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই চলমান বিক্ষোভে জনঅসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার চাপের মুখে রয়েছে। ২০২৪ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মিত্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর থেকে বাজেট পাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও সরকারকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
মঙ্গলবার ম্যাক্রোঁ প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীকে নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন।
ট্রাম্পের ভিন্ন দাবি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সের এই বিক্ষোভকে দেশটির ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ অভিবাসনের ফল হিসেবে দাবি করেছেন। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘এটি স্কুলের বিষয় নয়, এটি হচ্ছে ইসলাম একসময়ের এই মহান দেশটিকে অধিকার করে নিতে চাইছে।’
তবে রয়টার্স জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে ধর্ম বা অভিবাসনের কোনো বিষয় নেই। তাদের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষক সংকট, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ এবং স্কুলগুলোর অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান। ফ্রান্সের চরম ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি পার্টিও এই বিক্ষোভকে দেশটির অভিবাসন নীতির সঙ্গে যুক্ত করেনি।
মার্সেই, নঁত ও লিওঁ শহরের বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড। সেখানে লেখা ছিল— ‘তারা আসলে আমাদের নিয়ে ভাবে না’ এবং ‘বেঁচে থাকা নাকি পড়াশোনা’।
সেপ্টেম্বরে প্যারিসের সুবিধাবঞ্চিত একটি শহরতলিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এরই মধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক স্কুলে পানি চুঁইয়ে পড়া, ইঁদুরের উপদ্রবসহ নানা ধরনের সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যাও রয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ