আবার স্কুলে ফেরার স্বপ্ন দেখছে বাস্তুচ্যুত ইয়েমেনি শিশুরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে হাজারো পরিবার। এর প্রভাব পড়েছে শিশুদের শিক্ষাজীবনেও। সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে শত

2026-10-08T10:20:44+00:00
2026-10-08T10:21:13+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬,
২৩ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
আবার স্কুলে ফেরার স্বপ্ন দেখছে বাস্তুচ্যুত ইয়েমেনি শিশুরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:২০ এএম  আপডেট: ০৮.১০.২০২৬ ১০:২১ এএম
ইয়েমেনের তাইজ গভর্নরেটের সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে হাজারো বেসামরিক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। ছবি : রয়টার্স
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে হাজারো পরিবার। এর প্রভাব পড়েছে শিশুদের শিক্ষাজীবনেও। সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে শত শত স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ১ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। এতে আগে থেকেই সংকটে থাকা দেশটির শিক্ষা পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। 

১২ বছর বয়সী আহমেদ প্রতিদিন সূর্য ওঠার সময় তাইজ গভর্নরেটের জাবাল হাবাশি জেলার ওয়াদি বানি খাওলান এলাকার একটি বাস্তুচ্যুত শিবিরে ঘুম থেকে ওঠে। দুই সপ্তাহ ধরে এভাবেই কাটছে তার দিন। খেলাধুলা করে অন্য শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা তাঁবুর ভেতরে শুয়ে থাকা— এখন তার নিত্যদিনের রুটিন।

এর আগে, পশ্চিম তাইজ শহরের আল-আশরোহ গ্রামে পরিবারের সঙ্গে থাকত আহমেদ। সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় দুই সপ্তাহ আগে তাকে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে হয়।

শিবিরের জীবন তার কাছে একঘেয়ে। নিজের বাড়ি ও গ্রামের প্রায় সবকিছুই মনে পড়ে তার। তবে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে স্কুলে যাওয়ার দিনগুলোর কথা— বিশেষ করে স্কুলব্যাগ এবং প্রতিদিন সকালে হেঁটে স্কুলে যাওয়া।  

আহমেদ আল জাজিরাকে বলেছে, সংঘর্ষের সময় তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ছাড়তে গিয়ে সে স্কুলব্যাগটি সেখানেই রেখে এসেছে। আবার কখনো সেই ব্যাগ নিয়ে স্কুলে ফিরতে পারবে কি না, শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা হবে কি না— তা সে জানে না।

শিবিরে নেই স্কুল, বন্ধ বাড়ির স্কুলও

বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে আহমেদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার কোনো স্কুল নেই। শুধু তা-ই নয়, সে যদি নিজের গ্রামেও ফিরে যেতে পারত, সেখানকার স্কুলটিও এখন বন্ধ। 

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে শত শত স্কুলে ক্লাস বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ১ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে।

ইউনিসেফ আরও জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহেই ইয়েমেনে সংঘাতের কারণে ৫৭ হাজারের বেশি শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে। লড়াই অব্যাহত থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।  

প্রায় চার বছর তুলনামূলক শান্ত থাকার পর আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে সংঘর্ষ আবারও ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। নতুন করে শুরু হওয়া এই লড়াই দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে।

শিক্ষার চেয়ে এখন খাবার-পানির চিন্তা    

বাস্তুচ্যুত শিবিরে পৌঁছানোর পর আহমেদের পরিবারের সামনে সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায় মাথা গোঁজার ঠাঁই এবং খাবার-পানির ব্যবস্থা করা।

আহমেদ জানায়, যুদ্ধ তার বাড়ি ও স্কুলে পৌঁছানোর আগে পরিবার তার পড়াশোনা ও বাড়ির কাজ নিয়ে চিন্তা করত। এখন শিবিরে এসে শিক্ষার বিষয়টি পরিবারের কাছে আর অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। তাদের প্রধান চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁবু, খাবার ও পানি।    

বাস্তুচ্যুতদের এসব মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করাই মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।  

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২ অক্টোবর পর্যন্ত নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এর বাইরে ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর শুরু হওয়া যুদ্ধের কারণে আগে থেকেই ইয়েমেনে ৫০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে আছে।

ফ্রন্টলাইনের কাছের সব স্কুল বন্ধ 

জাবাল হাবাশি জেলার অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতদের শিবির ব্যবস্থাপনা ইউনিটের সমন্বয়ক মোহাম্মদ রাদমান বলেন, হাজারো শিক্ষার্থী বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে তাদের অনেককেই পড়াশোনা বন্ধ রাখতে হয়েছে। 

তার ভাষ্য, এসব শিক্ষার্থীর সামনে তেমন কোনো বিকল্প নেই। সংঘাতের সম্মুখসারির কাছাকাছি থাকা সব স্কুল বন্ধ। আবার দূরের কোনো সচল স্কুলে প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে গেলেও সেখানে আগে থেকেই অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ রয়েছে। ফলে বাস্তুচ্যুত শিশুদের জায়গা দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।

রাদমান সংঘাতপ্রবণ এলাকার স্কুলগুলোকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করেছেন— বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত স্কুল, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী থাকা স্কুল এবং যুদ্ধের সম্মুখসারিতে বা তার কাছাকাছি থাকা স্কুল। 

তার মতে, পরিস্থিতি ইয়েমেনি সমাজ, সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।


স্কুলের বাইরে শিশুদের সামনে আরও বড় ঝুঁকি

সাম্প্রতিক সংঘাত শুরুর আগেই ইয়েমেনে ৩২ লাখ শিশু স্কুলের বাইরে ছিল বলে জানিয়েছিল ইউনিসেফ। এখন নতুন করে বাস্তুচ্যুতির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

এসএএম অর্গানাইজেশন ফর রাইটস অ্যান্ড লিবার্টিজের সভাপতি তাওফিক আল-হুমাইদি বলেন, এই যুদ্ধ শিশুদের গৃহহীনতা, ভিক্ষাবৃত্তি এবং এমনকি জোরপূর্বক যোদ্ধা হিসেবে নিয়োগের ঝুঁকিতে ফেলছে। অর্থাৎ স্কুলের বাইরে শিশুদের জন্য যে বিকল্পগুলো তৈরি হচ্ছে, সেগুলো নিরাপদ নয়।

পরিবারগুলো আশা করছে, বাস্তুচ্যুত শিবিরে তাদের অবস্থান সাময়িক হবে। কিন্তু আল-হুমাইদির আশঙ্কা, বাস্তুচ্যুতির কারণে শিক্ষাজীবনে যে ছেদ পড়ছে, তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। 

দীর্ঘদিন শিবিরে থাকার ফলে শিশুদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বদলে যায়। এতে পরে আবার নিয়মিত স্কুলে ফিরে যাওয়াও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তিনি বলেন, ক্ষতি শুধু ক্লাস ও পাঠ্যসূচি থেকে পিছিয়ে পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্কুল শিশুদের সামাজিক ও মানসিক নিরাপত্তাও দেয়। স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে তারা সহিংসতা, শোষণ, জোরপূর্বক নিয়োগ ও শিশুশ্রমের ঝুঁকিতে পড়ে। 

নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাই প্রথম শর্ত

তাইজের এক শিক্ষক আবদুলকরিম বলেন, যুদ্ধের মধ্যে শিক্ষাদান করা অত্যন্ত কঠিন। তবে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, বিস্ফোরণের শব্দ, গুলির ভয় এবং অস্থির তাঁবুর মধ্যে শিশুদের দিয়ে পড়াশোনা করানো প্রায় অসম্ভব।

তার ভাষ্য, ভারী অস্ত্রের গোলাগুলির শব্দ শুনে ছোট শিশুদের কাঁদতে তিনি নিজে দেখেছেন।

তার মতে, প্রথমে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এরপর তাদের সচল স্কুলে ভর্তি করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে বিকল্প শিক্ষাকেন্দ্রও চালু করা যেতে পারে, যাতে যুদ্ধের মধ্যেও শিশুরা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে।

এডেনের সমাজবিজ্ঞানী আফরাহ আল-হুমাইকানি সতর্ক করে বলেছেন, ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় হাজারো শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময়ের জন্য শিক্ষার সুযোগ হারাতে পারে। এর ফলে দেশে একটি ‘নতুন নিরক্ষর প্রজন্ম’ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, ইয়েমেন সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে সংকটের প্রভাব কমানো সম্ভব।

এ জন্য প্রথমে শিশুদের জন্য নিরাপদ শিবির তৈরি করতে হবে। এরপর সেখানে শিক্ষক ও পাঠ্যবইয়ের ব্যবস্থা, শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া শিশুদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি এবং তাদের মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। 

আহমেদের মতো হাজারো ইয়েমেনি শিশুর এখন একটাই অপেক্ষা— যুদ্ধ থামুক, ঘর ফিরুক, আবার কাঁধে স্কুলব্যাগ উঠুক। 


সূত্র : আল-জাজিরা 

সময়ের আলো/ইউএমএইচ

  বিষয়:   ইয়েমেন  শিশু  বাস্তুচ্যুত 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: