রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলাপ-আলোচনা চলছে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ফোরামে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেন। সেই অধিবেশনের বাইরে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করেছেন। সবার কাছে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু সহসা রোহিঙ্গা সংকট দূর হচ্ছে না। বরং সংকট আরও গভীর হচ্ছে। এর সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে মানব পাচারের ঝুঁকি।
কি ধরনের ঝুঁকি— তা কক্সবাজারের শিবির থেকে সমুদ্রপথের চিত্র উঠে এসেছে সম্প্রতি এক রিপোর্টে। আর সেই রিপোর্ট তৈরি করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এই রিপোর্টে যেসব তথ্য উঠে এসেছে তা উদ্বেগজনক।
সম্প্রতি প্রকাশিত রিপোর্টটি সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কাছে বেশ কয়েকটি বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির থেকে ৪০৭টি মানব পাচারের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। শনাক্ত ভুক্তভোগীদের মধ্যে ২৪৮ জন পুরুষ, ৮৮ জন নারী, ৪১ জন ছেলে ও ২৯ মেয়ে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ছিলেন মোট ভুক্তভোগীর ৬১ শতাংশ। নারী ২২ শতাংশ, ছেলে ১০ শতাংশ ও মেয়ে ৭ শতাংশ।
চলতি বছরে ঝুঁকি আরও বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৪৯ জন এই সমুদ্রপথে যাত্রা করেছেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৫৬ শতাংশ বেশি। রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়, পুরুষ ও ছেলেদের ক্ষেত্রে পশুপালন, মাছ ধরা, বনের কাজ ও নির্মাণকাজের পাচারের ঘটনা পাওয়া গেছে। নারী ও মেয়েদের ক্ষেত্রে কারখানার কাজ, গৃহস্থালি শ্রম ও জোরপূর্বক যৌন কাজে পাচারের তথ্য রয়েছে। শিশু ও তরুণদের চাকরি, শিক্ষা কিংবা বিয়ের প্রলোভন দেখানোর বিষয়টিও উঠে এসেছে রিপোর্টে।
কেন এই ধরনের কাজ তারা বেছে নিচ্ছে— তার কারণ খুঁজতে গিয়ে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, শিবিরে শিক্ষা ও জীবিকার সীমিত সুযোগ, চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ ও নিরাপদ এবং নিয়মিত অভিবাসনের পথ না থাকা। এটি অনেক রোহিঙ্গাকে অনিরাপদ পথে যাওয়ার ঝুঁকিতে ফেলছে। এতে দালাল ও পাচারকারীদের ওপর নির্ভরতার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে জোর করে বিয়ে, জোর করে শ্রম, যৌন শোষণ, মুক্তিপণের জন্য অপহরণ ও জোর করে অপরাধমূলক কাজে যুক্ত করার মতো পাচারের ঝুঁকি রয়েছে। তবে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা ব্যক্তিদের ফেরত আনার পর কখনো কখনো আটক বা গ্রেফতার করা হয়।
চলতি বছরের ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে একটি নৌযান ডুবে প্রায় ২৫০ জন নিহত বা নিখোঁজ হয়। গত ৪ এপ্রিল কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়ে নৌযানটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল।
৯ এপ্রিল প্রবল বাতাস, উত্তাল সমুদ্র ও অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে নৌযানটি ডুবে যায়। নৌযানটি ডোবার আগে বা ডোবার সময় কোনো ধরনের বিপদ সংকেত পাঠানোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ১১ এপ্রিল ইন্দোনেশিয়াগামী একটি বাংলাদেশি পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ সমুদ্রে বিপদগ্রস্ত কয়েকজনকে উদ্ধার করে। উদ্ধার ৯ জনের মধ্যে ৮ জন পুরুষ ও একজন ছিলেন নারী।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৩ জন ছিলেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী। তবে কয়েকজনকে মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা জানতে চেয়েছেন, সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের কীভাবে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জানতে চাওয়া, তাদের মানব পাচারের ভুক্তভোগী হিসেবে কীভাবে যাচাই করা হয়।
জাতিসংঘের শরাণার্থী সংস্থা ইউএনএইচআরের আলাদা এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে নিখোঁজ বা নিহত হয়েছে। সে বছর ৬ হাজার ৫০০ বেশি রোহিঙ্গা বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় অংশ নেয়। আবার ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৪৯ জন সমুদ্রপথে যাত্রা করেছেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা ৫৬ শতাংশ বেশি।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে বেশ কয়েকটি বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে— সমুদ্র থেকে উদ্ধার ব্যক্তিদের নিরাপদ স্থানে নেওয়া, পাচারে ঝুঁকি শনাক্তকরণ, রোহিঙ্গা শিবিরে নারী ও শিশুদের সুরক্ষা. পাচারের ঘটনায় তদন্ত ও বিচার, ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে কি না। এ ছাড়াও মানব পাচারের মূল ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করতে বাংলাদেশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমছে। মিয়ানমারের সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চলতি বছর জাতিসংঘ ও অংশীদার সংস্থার কাছে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়— যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। অর্থ সহায়তাকারী অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে— কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও ইউকে।
জাতিসংঘ বলছে, এক বছরে রোহিঙ্গা সহায়তার অর্থের চাহিদা কমেছে ২৭৪ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের জন্য জাতিসংঘ ও অংশীদাররা দাতা সংস্থার কাছে ৯৩৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার চেয়েছিল। যা বাংলাদেশি টাকায় ১১ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা।
জানা গেছে, খাদ্যের জন্য প্রয়োজন হবে ৩ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। আশ্রয়ণের জন্য ১ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা, পানি স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির জন্য ৭৫৪ কোটি ও শিক্ষায় ৬৪৯ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।
জাতিসংঘ স্বীকার করেছে, আন্তর্জাতিক অর্থ সহায়তা কমেছে। তবে রোহিঙ্গাদের বড় অংশ এখনও মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ২০২৪ সালের শুরু থেকে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নতুন করে এসেছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে এখন প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। যে কারণে কক্সবাজারের অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোর ওপর মানবিক চাপ আরও বেড়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে