নানা নাটকীয়তার পর ফের জট খুলছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন নিয়ে আজ কমিশন সভা থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরপর নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করবে ইসি। তবে রমজান মাসের আগে ইউনিয়ন পরিষদের তিন ধাপের নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে ইসির।
এমনটি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সময়ের আলোকে বলেন, সোমবার (আজ) আমাদের কমিশন সভা আছে। সেখানে বেশ কিছু এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা হবে। তবে এর মধ্যে অন্যতম এজেন্ডা হলো ইউপি নির্বাচন। আমরা জানুয়ারি থেকে নির্বাচন শুরু করতে চাচ্ছি এবং ঈদের আগে তিন ধাপের ভোট শেষ করতে চাচ্ছি। আমাদের এমন পরিকল্পনা রয়েছে। কমিশন সভা শেষে ইউপি নির্বাচনের রোডম্যাপ জানানো হবে।
এর আগে গত ৮ অক্টোবর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, সোমবার কমিশন সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে আমরা দিনক্ষণ চূড়ান্ত করে জানিয়ে দেব। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কয় স্লটে, কবে কবে হবে, সব জানিয়ে দেব।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপটা কখন হবে জানতে চাইলে আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, তার পরপরই হবে। এ মাসে হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব কাজ ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকবে। সোমবারে যেহেতু একটা কমিশন মিটিং আছে, সেখানে আমরা আলোচনা করব। তারপরই বলি। এর আগে তিনি জানিয়েছেন আগামী জুনের মধ্যে ইউপি ভোট শেষ করবে কমিশন।
এর আগে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে তফসিল ও নভেম্বরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরুর কথা জানিয়েছিল ইসি। নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ জোরেশোরে চলছিল ভোটের প্রস্তুতি। এরই ধারাবাহিকতায় চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ, ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ, প্রার্থীদের জন্য নতুন আচারণবিধি জারি, বাজেট তৈরি, নির্বাচনিসামগ্রী কেনাকাটা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকসহ ভোটের সব প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করেছিল ইসি।
এরপর নির্বাচন উপলক্ষে গত ২৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎও করেছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে ইসির পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে নির্বাচন ভবনে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সিইসি।
সেসময় তিনি বলেন, নভেম্বরের শেষের দিকে বা ডিসেম্বরে ভোট হতে পারে। এ জন্য আমরা বার্ষিক পরীক্ষা অ্যাডজাস্ট করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলব। আমরা স্থানীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। বিধিমালা ভেটিং হয়ে এসে গেছে। এখন শুধু গেজেট করা বাকি।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করে এসে সচিবকে আমি বলেছি সার্বিক প্রস্তুতি নেন। সিইসির এমন ঘোষণার পর আরও গতি বাড়ে ভোটের প্রস্তুতির। এরপর গত ১৪ সেপ্টেম্বর স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে কমিশন বৈঠক করে নির্বাচন কমিশন। বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, আগামী ১২ নভেম্বর থেকে সাত ধাপে ৮০টি উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে প্রথম ধাপের ভোট। দ্বিতীয় ধাপে ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপে ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপে ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপে ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপে ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপের ভোট অনুষ্ঠিত হবে ২৭ মে।
তিনি বলেন, দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৮০টি। এগুলোতে ৭ ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম ধাপে ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করা হতে পারে। আমরা চেষ্টা করব ৬৪টি জেলাতেই স্থানীয় নির্বাচন একসঙ্গে শুরু করার।
ইসির এমন ঘোষণার এক দিন পর অর্থাৎ গত ১৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার কিছু জানে না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও কিছু জানে না এবং সরকারের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে চিঠি কিংবা অন্য কোনোভাবে যোগাযোগ বা আলোচনা হয়নি।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, সংবিধানে জাতীয় ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ইসি স্বাধীন হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সিদ্ধান্ত সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকারের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন ও সরকার সমন্বয় করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ও জাহেদ উর রহমানের এমন বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে ইসি। এর কিছু সময় পর ইসি সচিব আখতার আহমেদ নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের বলেন, ইউপি নির্বাচনের যে সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে তা একেবারেই প্রাথমিক সময়সূচি। ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে।
এরপর গত ১৭ সেপ্টেম্বর নির্বাচন ভবনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করে ইসি। বৈঠকের পর নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বিষয়ে বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অংশগ্রহণকারী সবাই একমত হয়েছেন যে, আগামী বছরের জুনের আগেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। তিনি বলেন, নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাস্তবসম্মত চ্যালেঞ্জ উঠে এসেছে। এবারের বন্যায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা খাতে যে ব্যাঘাত ঘটেছে, তার প্রভাব এখনও রয়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনও সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
ফলে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কমিশনকে অনুরোধ জানিয়েছে যেন কোনোভাবেই পরীক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত না হয়। তিনি বলেন, ইউপি নির্বাচন ঠিক কবে থেকে শুরু হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনই ঘোষণা না করলেও সমাপ্তির সময়সীমা হিসেবে আগামী ৬ জুনের আগের কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
কমিশন আপাতত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়েই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আলোচনা করছে, তবে আইন অনুযায়ী অন্যান্য নির্বাচনের সময় এলে সেগুলোও যথাসময়ে সম্পন্ন করা হবে। মূলত ১৭ তারিখের ওই বৈঠকের পরই ভাটা পড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির। এরপর স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে গত ২১ সেপ্টেম্বর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত সভাটি গত ১৭ সেপ্টেম্বর বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। এরপর স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপলক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পূর্বঘোষিত ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বরের সংলাপও স্থগিত করে ইসি।
এরপর গত ২৯ সেপ্টেম্বর বিকালে রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা সভা শেষে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, আগামী জানুয়ারি থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে এবং তা ৬ জুন পর্যন্ত চলবে। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি করতে হবে। প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের এমন ঘোষণার পর ফের নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণা করতে যাচ্ছে ইসি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে