ঢালিউডের গ্ল্যামারাস ঘরানার অভিনেত্রী থেকে শুরু করে ওটিটি ও বড়পর্দায় নিজেকে আমূল বদলে ফেলা এক চিত্রনায়িকার নাম তমা মির্জা। ২০১৫ সালে শাহনেওয়াজ কাকলী পরিচালিত ‘নদীজন’ চলচ্চিত্রে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন তমা।
তবে সত্যিকার অর্থে তার ক্যারিয়ারে নায়িকা থেকে পরিপূর্ণ একজন অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে আমূল বদলে ফেলা এবং দর্শকদের কাছে একজন সুঅভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার যাত্রাটা শুরু হয় পরিচালক রায়হান রাফীর ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’ দিয়ে। এখান থেকে শুরু হয় তার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে শক্তিশালী অধ্যায়। এরপর ‘সাত নম্বর ফ্লোর’, ‘ফ্রাইডে’ কিংবা বড়পর্দার ব্লকবাস্টার ‘সুড়ঙ্গ’ এবং ‘দাগী’ প্রতিটি প্রজেক্টেই তিনি প্রমাণ করেছেন নিজের ভিন্ন রূপ। সম্প্রতি নতুন প্রজেক্টের ব্যস্ততা, ভিন্নধর্মী চরিত্র নির্বাচন এবং অভিনয়জীবনের বাইরেও নতুন পেশাগত সংযোজন নিয়ে আনন্দ সময়ের মুখোমুখি হয়েছেন এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মইনুল হক রোজ
সাম্প্রতিক ব্যস্ততা ও নতুন কাজের খবর নিয়ে শুরু করা যাক...
সত্যি বলতে, এখন খুব ভালো একটি কাজের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। কাজের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং কাজের গুণগত মান নিয়ে ভাবার সময় এটা। বেশ কিছু নতুন প্রজেক্টের স্ক্রিপ্ট পড়া ও প্রস্তুতির কাজ চলছে। এর মধ্যে একটি সিনেমার কাজ শেষ করেছি। আমার নতুন এই সিনেমাটিতে সহশিল্পী হিসেবে যারা আছেন তারা সবাই গুণী। আপাতত তাদের নাম বলছি না। এটা চমক হিসেবেই থাকুক। কাজটি নিয়ে আমি খুব আশাবাদী। গল্পটা দারুণ। আশা করছি, এটি দর্শকদের জন্য দারুণ একটি উপহার হতে যাচ্ছে।
‘সুড়ঙ্গ’ এবং ‘দাগী’র সাফল্যের পর আফরান নিশোর সঙ্গে আপনার জুটিকে দর্শকরা বেশ লুফে নিয়েছেন। নিশোর সঙ্গে এই কেমিস্ট্রি নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন? সামনে আপনাদের জুটিকে কি আবার একসঙ্গে দেখা যাবে?
নিশো ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা সবসময়ই দারুণ শিক্ষণীয়। তিনি কাজের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিবেদিত এবং একজন অসাধারণ সহশিল্পী। ‘সুড়ঙ্গ’ বা ‘দাগী’র মতো কাজগুলোতে আমাদের মধ্যে দারুণ এক বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল, যা দর্শকরা বড়পর্দায় পছন্দ করেছেন। আর দর্শকরা যেহেতু আমাদের জুটি পছন্দ করেছেন দুবারই সেহেতু সামনে আমাদের জুটি আবার অবশ্যই দেখা যেতে পারে যদি প্রযোজনা সংস্থা এবং নির্মাতারা চান।
এই সিনেমাটির বাইরে আর কি নতুন কাজ করা হচ্ছে?
হ্যাঁ। এরই মধ্যে একটি বিজ্ঞাপনের কাজ করা হয়েছে। পাশাপাশি ফটোশুটের কাজ তো হচ্ছেই। এর বাইরে দুটি সিনেমাতে কাজের কথা চলছে। চূড়ান্ত হলেই সবাইকে জানাব।
আপনি বেশ আগে কলকাতার গুণী নির্মাতা অঞ্জন দত্তের ‘দুই বন্ধু’ ওটিটি সিরিজে অভিনয় করেছেন। ওপার বাংলায় এটি আপনার প্রথম কাজ। সেই কাজটি এখনও মুক্তি পায়নি কেন? আর কাজটির অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
আসলে মুক্তির বিষয়ে কোনো তথ্য আমিও জানি না। কেন এতদিন মুক্তি পায়নি সেটার কারণ জানা নেই। যাই হোক এটা নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। এটির প্রযোজক-পরিচালকই ভালো বলতে পারবেন তারা কবে, কীভাবে কী করবেন। আমি আর এটা নিয়ে কিছুই ভাবছি না।
আর কাজের অভিজ্ঞতা যদি বলেন, অঞ্জন দত্তের মতো কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বের পরিচালনায় কাজ করার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। প্রথমে কিছুটা ভয় ও মানসিক চাপ কাজ করছিল, কিন্তু শুটিং শুরু হওয়ার পর বুঝেছি তিনি এক অসাধারণ ‘ক্যাপ্টেন অব দ্য শিপ’। কলকাতার টিমের কাজের পরিবেশ দারুণ গোছানো ছিল, নির্দিষ্ট শিফটে কাজ শেষ করার অভ্যাস রয়েছে ওদের। শেখার দিক থেকে এটি আমার ঝুলিতে বড় একটি প্রাপ্তি।
সাধারণ বাণিজ্যিক ধারার রুপালি পর্দার নায়িকা থেকে একুশ শতকের এই প্রথাবিরোধী, অভিনয়নির্ভর তমা মির্জা— নিজেকে রূপান্তরের ঝুঁকিটি কীভাবে নিলেন?
সত্যি বলতে, একটা সময় পর আমার মনে হচ্ছিল আমি কেবল মেকআপ নিয়ে মেকআপের পেছনেই দৌড়াচ্ছি, অভিনেতা হিসেবে আমার ক্ষুধা মিটছে না। সেই সময়ে রায়হান রাফী ওটিটিতে খাঁচার ভেতর অচিন পাখিতে একেবারেই ভিন্ন ধারার একটি চরিত্রে অভিনয় করার প্রস্তাব দেয়। ‘পাখি’ নামের সেই চরিত্রটিতে কোনো গ্ল্যামার ছিল না, ছিল নিখাদ অভিনয়ের জায়গা। তো আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম নিজেকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলব, ক্যামেরার সামনে দেখতে কেমন লাগছে তার চেয়ে চরিত্র কেমন ফুটছে সেটিকে প্রাধান্য দেব। দর্শক যখন সেই পরিবর্তনকে ভালোবাসা দিয়ে গ্রহণ করলেন, তখনই বুঝেছিলাম ক্যারিয়ারে যে ঝুঁকিটি আমি নিয়েছিলাম তা ঠিক ছিল।
অভিনয়জীবনের পাশাপাশি সম্প্রতি আপনাকে একটি ব্যাংকে করপোরেট দায়িত্বে যুক্ত হতে দেখা গেছে। লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের জগৎ আর ব্যাংকের শৃঙ্খল জীবনের ব্যালেন্স করছেন কীভাবে?
জীবন সবসময়ই নতুন কিছু শেখায়! ব্যাংকিং সেক্টরে যুক্ত হওয়াটা আমার জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ ও নতুন দিগন্ত। আমি বিশ্বাস করি, একজন মানুষের শেখার কোনো বয়স বা সীমা নেই। অভিনয়ের প্রতি আমার ভালোবাসা চিরন্তন, সেটি আমার রক্তে। কিন্তু পেশাগত জীবনে একটা ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিজের ডিসিপ্লিন বাড়াতে সাহায্য করে। কাজের সময়সূচি ও শুটিং পরিকল্পনা আগের চেয়ে অনেক বেশি শৃঙ্খল উপায়ে সাজাতে হচ্ছে, যা আমাকে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী করছে।
ঢালিউডের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কেমন?
আমাদের ঢালিউডের বর্তমান সময়টা দারুণ সম্ভাবনাময়। এখন ওটিটি এবং বড়পর্দা মিলিয়ে খুব ভালো ভালো কাজ হচ্ছে, দর্শকরাও হলে ফিরে আসছেন। এই ইতিবাচক পরিবর্তন আমাদের ইন্ডাস্ট্রির আগামী দিনের পথচলাকে আরও সুগম করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
ক্যারিয়ারের এই শীর্ষ সময়ে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কী?
সত্যি বলতে কোনো ধরাবাঁধা পরিকল্পনা নেই। আমি কেবল এমন কিছু কাজ করে যেতে চাই, যেগুলো দেখে দর্শকরা পরবর্তীতে বলতে পারেন, ‘তমা মির্জা এই চরিত্রটিতে দারুণ অভিনয় করেছিলেন।’ সংখ্যার চেয়ে মান এবং চরিত্রের বৈচিত্র্যই আমার প্রধান লক্ষ্য।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে