সমুদ্রতটে ঘুরে বেড়ায় একটি কালো ল্যাব্রাডর। তার কাজ হারিয়ে যাওয়া মানুষ খোঁজা নয়, বরং সমুদ্রের পাড়ে শৈবাল ও নানা সামুদ্রিক প্রাণীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক ক্ষতিকর প্রাণী শনাক্ত করা। চেহারায় অনেকটা পিচ্ছিল আস্তরণের মতো এই প্রাণীকে বলা হয় ‘কার্পেট সি স্কুইর্ট’। দেখতে অদ্ভুত বলে এর আরেক নাম ‘সাগরের বমি’।
প্রাণীটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অন্য সামুদ্রিক জীব ঢেকে ফেলতে পারে। তাই একে খুঁজে বের করতে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে ছয় বছর বয়সি কালো ল্যাব্রাডর স্কিয়াথকে। এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রাণী কল্যাণ সংস্থা আইএফএডব্লিউ তাকে ২০২৬ সালের বর্ষসেরা প্রাণী হিসেবে নির্বাচিত করেছে।
নাকের মাধ্যমে লুকানো প্রাণীর সন্ধান
স্কটল্যান্ডের গ্লেনকোর কাছে বসবাস করেন সামুদ্রিক পরিবেশবিদ ড. টেক্সা সিম। ছোট থেকেই স্কিয়াথকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। প্রথমে পাহাড়ি এলাকায় হারিয়ে যাওয়া মানুষ খুঁজে বের করার জন্য প্রশিক্ষণ পায় কুকুরটি। এই কাজে তার দক্ষতা দেখে সিমের মনে হয়, একই ঘ্রাণশক্তি সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষার কাজেও ব্যবহার করা সম্ভব।
সেই চিন্তা থেকেই শুরু হয় নতুন প্রশিক্ষণ। স্কিয়াথকে কার্পেট সি স্কুইর্টের গন্ধ চিনতে শেখানো হয়। এখন ভাটার সময় সমুদ্রের পানি নেমে গেলে মালিকের সঙ্গে উপকূলে যায় সে। শৈবালের আড়ালে কিংবা ঝিনুক চাষের খাঁচা ও ভাসমান কাঠামোর গায়ে লুকিয়ে থাকা প্রাণীটিকে খুঁজে বের করে।
এই সামুদ্রিক প্রাণীটি সহজে চোখে পড়ে না। কখনো পিচ্ছিল আস্তরণের মতো পাথর বা অন্য কিছুর গায়ে লেগে থাকে। চারপাশের শৈবালের সঙ্গে মিশে থাকায় সাধারণভাবে দেখে একে শনাক্ত করা কঠিন। কিন্তু স্কিয়াথ নিজের নাক দিয়ে খুঁজে ঠিক জায়গাটি শনাক্ত করতে পারে।
প্রশিক্ষণের আরেকটি বিশেষ দিক হলো, প্রাণীটিকে খুঁজে পেলে স্কিয়াথ ঘেউ ঘেউ করে না বরং স্থির হয়ে তাকিয়ে থেকে মালিককে সংকেত দেয়। পাহাড়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষ খুঁজে পেলে তাকে ঘেউ ঘেউ করে জানানোর প্রশিক্ষণ রয়েছে তার। কিন্তু পরিবেশ সংরক্ষণের কাজে নীরবে সংকেত দেওয়াই বেশি কার্যকর।
পাহাড়ের উদ্ধারকারী এখন সমুদ্রের প্রহরী
সিম জানিয়েছেন, শুরুতে তিনি নিজেও নিশ্চিত ছিলেন না যে কুকুরকে দিয়ে সামুদ্রিক প্রাণী শনাক্ত করা সম্ভব হবে কি না। এটি ছিল পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। কিন্তু স্কিয়াথ প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল দেখিয়েছে। তার ঘ্রাণশক্তি কাজে লাগিয়ে এমন জায়গায় থাকা ক্ষতিকর প্রাণীও শনাক্ত করা যাচ্ছে, যা মানুষের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে।
পরিবেশ সংরক্ষণে কুকুরের ঘ্রাণশক্তি অবশ্য নতুন নয়। স্থলভাগে বিপন্ন প্রাণীর সন্ধান, বন্যপ্রাণীর চলাচল শনাক্ত করা এবং পরিবেশ বিষয়ক অপরাধের তদন্তেও প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করা হয়। তবে সমুদ্রের পরিবেশে আক্রমণকারী প্রাণী শনাক্ত করার কাজে এ ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবহার এখনও নতুন।
বাংলার পাঠকের কাছে ‘সাগরের বমি’ নামটি অদ্ভুত লাগতে পারে। তবে এটি কোনো উদ্ভিদ বা শৈবাল নয়। কার্পেট সি স্কুইর্ট একটি সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী। এর বৈজ্ঞানিক নাম ডিডেমনাম ভেক্সিলাম। এটি দলবদ্ধভাবে বেড়ে পাথর, ঝিনুক, নৌঘাট ও পানির নিচে থাকা বিভিন্ন কাঠামোর ওপর চাদরের মতো স্তর তৈরি করতে পারে।
কেন এত বিপজ্জনক ‘সাগরের বমি’?
সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রাণীটির উৎপত্তি জাপানে। যুক্তরাজ্যে ২০০৮ সালে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূল ও ওয়েলসে এর উপস্থিতি শনাক্ত হয়। এরপর দেশটির বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে এটি।
কার্পেট সি স্কুইর্ট দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে, বিশেষ করে গরমের মাসগুলোতে। এর পুরু আস্তরণ অন্য সামুদ্রিক প্রাণীকে ঢেকে ফেলে এবং তাদের খাবার ও জায়গা পাওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেয়। এভাবে স্থানীয় প্রজাতির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে গিয়ে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করতে পারে। সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে এর বিস্তার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্ষতি শুধু সামুদ্রিক প্রাণীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ঝিনুক চাষের খাঁচা, মাছ চাষের অবকাঠামো, নৌঘাট ও নৌযানের বিভিন্ন অংশে এই প্রাণী জমে যেতে পারে। এতে যন্ত্রপাতি আটকে যাওয়া থেকে শুরু করে পরিষ্কার ও নিয়ন্ত্রণের বাড়তি খরচ তৈরি হয়। ইউরোপজুড়ে এ ধরনের ক্ষতিকর সামুদ্রিক প্রাণী নিয়ন্ত্রণ ও পরিষ্কার করতে প্রতি বছর লাখ লাখ পাউন্ড ব্যয় হয়।
বাঙ্গর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ড. মার্টিন কুরের মতে, প্রশিক্ষিত কুকুরের সাহায্যে পানির পরিবেশে আক্রমণকারী প্রজাতির উপস্থিতি দ্রুত শনাক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে এমন কিছু বিপজ্জনক পরিবর্তনও আগেভাগে ধরা পড়তে পারে, যা অন্যভাবে নজরে আসত না।
স্কিয়াথের এই কাজ তাই শুধু একটি কুকুরের পুরস্কার পাওয়ার গল্প নয়। এটি দেখাচ্ছে— মানুষের পরিচিত একটি প্রাণীর ঘ্রাণশক্তি কীভাবে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নতুন পথ খুলে দিতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে