চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে আমদানি পণ্য খালাস করা হয় ছোট জাহাজে করে। যা লাইটার জাহাজ নামে পরিচিত। নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে নৌপরিবহন অধিদফতর ৮৮ লাইটার জাহাজের বে-ক্রসিং সনদ স্থগিত করেছে। এতে লাইটার জাহাজ সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সংকটের কারণে বড় জাহাজের পণ্য খালাস দীর্ঘায়িত হচ্ছে। গুদামে পৌঁছাতে সময়ক্ষেপণে আমদানি পণ্যের দাম বৃদ্ধির শঙ্কাও বেড়েছে। যা সরাসরি প্রভাব পড়বে ভোক্তার ঘাড়ে। আমদানিতে বাড়তি ব্যয় ভোক্তার কাছ থেকেই আদায় করেন ব্যবসায়ীরা।
অভিযোগ রয়েছে, সিরিয়াল না মেনে বহির্নোঙরে যাচ্ছে লাইটার জাহাজ। তাই নিয়ম রক্ষায় ৮৮ লাইটার জাহাজের সনদ স্থগিত করা হয়েছে। পরিচালনাকারী সংস্থা ডব্লিউটিসি বলছে, সিরিয়ালের সনদ স্থগিত করা ঠিক আছে। তবে এখন বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে মিলছে না লাইটার জাহাজ। পণ্য খালাসে নতুন করে তৈরি হয়েছে সংকট।
চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরসহ সারা দেশে পণ্য পরিবহন কাজে নিয়োজিত আছে অন্তত ১২শর বেশি লাইটার জাহাজ। এসব জাহাজের বড় অংশ বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে লাইটার কাজে যুক্ত। জাহাজগুলো ঘাট থেকে বহির্নোঙরে যাওয়ার সিরিয়াল নির্ধারণ করা হয় প্রয়োজন সাপেক্ষে। এই সিরিয়াল দেওয়ার দায়িত্বে আছে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (ডব্লিউটিসি)।
জাহাজ মালিকদের পক্ষে সংগঠনের উদ্যোগে লাইটার জাহাজের কোনটি আগে বা পরে যাবে তা নির্ধারণ করা হয়। সিরিয়াল নিয়েই লাইটার জাহাজ ঘাট থেকে যায় বন্দর বহির্নোঙরে। এসব লাইটার জাহাজ বহির্নোঙরে পৌঁছার অন্যতম যোগ্যতা বে-ক্রসিং বা সমুদ্রসীমা অতিক্রম সনদ। নৌ বাণিজ্য অধিদফতর প্রয়োজনীয় সার্ভে প্রক্রিয়া শেষে এই সনদ প্রদান করে। সনদ না থাকলে চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল পার হয়ে বহির্নোঙরে যেতে পারে না। কারণ বহির্নোঙরের পুরো এলাকাটিই বঙ্গোপসাগর।
২ লাখ টন পণ্য পরিবহন সক্ষমতা কমেছে
চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরে নোঙর করে থাকে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি পণ্য নিয়ে আসা বড় জাহাজ। যা মাদার ভেসেল নামে পরিচিত। জাহাজগুলো নোঙর করার পরপরই লাইটার জাহাজের প্রয়োজন হয়। বহির্নোঙরে কর্মরত শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা ডব্লিউটিসির কাছে লাইটার জাহাজের ডিমান্ড জানায়। ডিমান্ড অনুযায়ী লাইটার জাহাজ বহির্নোঙরে পৌঁছে।
এরপর শুরু হয় লাইটার বা ছোট জাহাজে করে বড় জাহাজের পণ্য খালাস। কোনো কারণে ডিমান্ড অনুযায়ী লাইটার জাহাজ পেতে দেরি হলে বন্ধ থাকে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস। ৭-৮ দিনের স্থলে একেকটি বড় জাহাজ বহির্নোঙরে অবস্থার সময় ২০ দিন পর্যন্ত পেরিয়ে যায়। ৮৮ লাইটার জাহাজের সনদ স্থগিত থাকায় সংকট বেড়েছে। জাহাজ মালিকদের মতে অন্তত দৈনিক ২ লাখ টন পণ্য খালাস সক্ষমতা কমেছে। এ ছাড়া বড় জাহাজ বেশি দিন অবস্থান করলে আমদানিকারককে ডেমারেজ বা ক্ষতিপূরণ গুনতে হয়।
প্রতি বড় জাহাজ প্রতিদিন অবস্থানের বিপরীতে ১০ হাজার মার্কিন ডলার করে ডেমারেজ গুনতে হয়। আর আমদানিকারক বাজারে ভোক্তার কাছ থেকে পণ্যের দাম বাড়িয়ে সেই ডেমারেজের অর্থ তুলে নেয়। এক কথায় আমদানি পণ্যবাহী বড় জাহাজ বহির্নোঙরে বেশি দিন অবস্থান করলে সাধারণ ভোক্তাদেরও খেসারত দিতে হয়।
কেন জেটির পরিবর্তে বহির্নোঙরে খালাস
চট্টগ্রাম বন্দরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসে পণ্যবাহী বড় জাহাজ বা মাদার ভেসেল। এসব জাহাজের ড্রাফট (জাহাজ ভেসে থাকা অবস্থায় পানির লেভেল থেকে নিচের অংশ পর্যন্ত) থাকে ১০ মিটারের বেশি। চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল পার হতে পারে সর্বোচ্চ ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ। মাদার ভেসেলের বেশিরভাগের ড্রাফট ১২ মিটার বা তার চেয়েও বেশি।
এসব জাহাজ কোনোভাবে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ভিড়ে পণ্য খালাস করতে পারে না। জাহাজগুলোকে জেটিতে ভেড়ার অনুমতি দেওয়া হয় না। জেটিতে ভিড়লে চ্যানেলে আটকে যাবে। বন্ধ হয়ে যাবে জাহাজ চলাচল। তাই মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসের ভরসা লাইটার জাহাজ। ছোট ছোট জাহাজগুলো মাদার ভেসেল থেকে প্রতি ট্রিপে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টন পর্যন্ত পণ্য খালাস করতে পারে।
এভাবে একটি মাদার ভেসেল থেকে চার-পাঁচটি লাইটার জাহাজ ৭-৮ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করে নিয়ে আসে ঘাটে। বহু লাইটার জাহাজ বহির্নোঙর থেকে রওয়ানা দেয় দেশের বিভিন্ন নৌ-বন্দরের উদ্দেশে। লাইটার জাহাজ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরে নোঙর করা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসের বিকল্প নেই। ৮৮ লাইটার জাহাজের বে-ক্রসিং সনদ স্থগিত থাকায় এসব আর বহির্নোঙরে যেতে পারছে না। বহির্নোঙরে এখন সেই ৮৮ লাইটার জাহাজের সংকট সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। ডিমান্ড অনুযায়ী লাইটার জাহাজও মিলছে না।
৪০০ লাইটার জাহাজ নিয়ে মাথাব্যথা
চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙর এবং দেশের বিভিন্ন নৌপথে অন্তত ১২শর বেশি লাইটার জাহাজ চলাচল করে। ডব্লিউটিসির অধীনে এসব জাহাজ সিরিয়াল নিয়ে পণ্য পরিবহন খালাসে যুক্ত হয়। এসব জাহাজের মধ্যে ৪০০ লাইটার জাহাজ কোনো নিয়ম মানে না। সংগঠনের সিরিয়াল না নিয়ে ইচ্ছামতো পণ্য পরিবহন করে।
এতে সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষমাণ জাহাজগুলো পরিবহনের সুযোগ পায় না। অলস বসে থাকায় ভাড়া আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে লাইটার জাহাজ মালিক। ৪শ জাহাজ নিয়ম না মেনে চলাচল করায় ডব্লিউটিসির কাছে অভিযোগ আসে। বিষয়টি যাচাই করার পর ডব্লিউটিসি নৌপরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালকের কাছে অভিযোগ জানায়। অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েক দফায় ৮৮টি লাইটার জাহাজের বে-ক্রসিং সনদ স্থগিত করা হয়।
এ ব্যাপারে ডব্লিউটিসির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, নিয়ম না মানায় আমরা নৌপরিবহন অধিদফতরকে ৪শ জাহাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছি। আমাদের অভিযোগ খতিয়ে দেখে কয়েক দফায় ৮৮ জাহাজের বে-ক্রসিং সনদ বাতিল করা হয়েছে।
তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ এই প্রশ্নে তিনি বলেন, তারা সিরিয়াল মানে না। সংগঠনের নিয়ম লঙ্ঘন করে এসব জাহাজের মালিকরা জাহাজ পরিচালনা করছে। অনেক সময় সংগঠনের নীতিমালা পরিপন্থী কম ভাড়ায় আমদানিকারকদের প্রলুব্ধ করে পণ্য পরিবহন ও বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে যুক্ত হচ্ছে। আমাদের অভিযোগ খতিয়ে দেখেই জাহাজগুলোর বে-ক্রসিং সনদ স্থগিত করা হয়।
লাইটার জাহাজ মালিক সমিতির নেতা হাজি শফিক বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে ডব্লিউটিসির অধীনে জাহাজ পরিচালনা করে আসছি। কিন্তু কিছু জাহাজ মালিক সংগঠনের নিয়ম শৃঙ্খলা উপেক্ষা করে কম ভাড়ায় পণ্য লাইটার কাজে যুক্ত হচ্ছে। এতে আমাদের মতো লাইটার জাহাজ মালিকরা পণ্য পরিবহনের কাজ পায় না। আবার অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে লাইটার কাজে যুক্ত জাহাজ মালিকরা বেশি সুবিধা পাচ্ছে। এ জন্য নৌপরিবহন অধিদফতর ৮৮ জাহাজের বে-ক্রসিং সনদ স্থগিত করেছে।
সনদ স্থগিত করার চিঠিতে যা বলা আছে
নৌপরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক কমডোর মো. শফিউল বারী স্বাক্ষরিত চিঠিতে কয়েক দফায় ৮৮ লাইটার জাহাজের বে-ক্রসিং সনদ বা অনুমতি স্থগিত করা হয়েছে। (স্মারক নম্বর : ১৮.১৭.০০০০.০০০.০১৫.৯৯.০০৬০.২১.৮৬৯)। গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে এসব চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলো ও তৎসংলগ্ন এলাকা থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, নির্বিঘ্ন ও সুশৃঙ্খলভাবে পণ্য পরিবহন করার স্বার্থে সরকার নৌপরিবহন অধিদফতর থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত লাইটার জাহাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দরগুলো পণ্য পরিবহন নীতিমালা ২০২৪ প্রণয়ন করে।
নীতিমালার ৭ দশমিক ১ ধারা অনুযায়ী ডব্লিউটিসি কর্তৃক বরাদ্দ বা ছাড়পত্র ব্যতীত কোনো লাইটার জাহাজ বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর, সমুদ্র উপকূলীয় নদীবন্দর ও নদীর উভয় পাড়ে অবস্থিত সব প্রকার জেটি, সমুদ্র নোঙরে আগত মাদার ভেসেল থেকে পণ্য পরিবহন করতে পারবে না। ব্যত্যয়ে মহাপরিচালক, নৌপরিবহন অধিদফতর উক্ত লাইটার জাহাজের সার্ভে, উপকূল অতিক্রমের অনুমতিপত্র বাতিল বা স্থগিত করিতে পারবে।
তবে শর্ত থাকে, যেসব ফ্যাক্টরি ও গ্রুপ অব কোম্পানির নিজস্ব লাইটার জাহাজ রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নৌপরিবহন অধিদফতরের অব্যাহতিপত্র সাপেক্ষে তাদের নিজস্ব পণ্য কেবল নিজস্ব জাহাজে পরিবহন করতে পারবে। যদি ফ্যাক্টরি ও গ্রুপ অব কোম্পানির পণ্য পরিবহনের জন্য অতিরিক্ত লাইটার জাহাজ প্রয়োজন হয়, তবে ডব্লিউটিসির মাধ্যমে বরাদ্দ গ্রহণ করতে হবে। এ অবস্থায় ডব্লিউটিসিসির ছাড়পত্র ব্যতীত পণ্য পরিবহনের কাজে নিয়োজিত থাকায় লাইটার জাহাজের বে-ক্রসিং সনদ স্থগিত করা হয়েছে।
জাহাজে ভাসছে কয়েক লাখ টন পণ্য
চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরে চলতি মাসের শুরুতে অন্তত ৫০টি বড় জাহাজ ভেসেছিল। গত কয়েকদিনে বড় জাহাজ সংখ্যা কমেছে। এসব জাহাজে আছে চিনি, সিমেন্ট ক্লিংকার, লবণ, গম থেকে নানা ধরনের পণ্য। বেশিরভাগ জাহাজের ড্রাফট বেশি হওয়ায় বহির্নোঙরেই পণ্য খালাস করতে হবে। জেটিতে ভিড়বে মাত্র কয়েকটি জাহাজ। তাও পণ্য খালাসের পর জাহাজের ড্রাফট ১০ মিটারের নিচে এলে। বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে ছোট লাইটার জাহাজের তীব্র সংকট এখনও অব্যাহত আছে।
এ ব্যাপারে ডব্লিউটিসির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, ১০ দিন আগেও লাইটার জাহাজের সিরিয়াল দেওয়া হয় রেশনিং করে। তবে কয়েকদিন ধরে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। কিন্তু সংকটের সুরাহা হচ্ছে না। বহির্নোঙরে পণ্যবাহী আবার বাড়ছে। এতে লাইটার জাহাজ আবার প্রকট রূপ নিতে পারে। সনদ স্থগিত হওয়া লাইটার জাহাজগুলো নিয়ম মেনে কাজে যুক্ত হলে সংকট আর থাকবে না মনে করছি।
৮৮ লাইটার জাহাজের বে-ক্রসিং সনদ স্থগিতাদেশ কবে প্রত্যাহার করা হবে তা জানতে নৌ বাণিজ্য অধিদফতরের নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন শেখ জালাল উদ্দিন গাজি ও ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল আলমকে কয়েক দফা ফোন করলেও রিসিভ করেননি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে