সংগৃহীত ছবিসড়কে মোটরসাইকেল দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে একটি ট্রাক থামানো হয়। এরপর চালককে হাতকড়া পরিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘোরানো এবং ট্রাকে তল্লাশির নামে ৩০ হাজার ইয়াবা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাতকানিয়া থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও তাদের কথিত সোর্সদের বিরুদ্ধে। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া এলাকায় গত ২৪ অক্টোবর রাতে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগে জানা গেছে। এ ঘটনায় দুটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ থাকার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক। বিষয়টি নজরে আসার পর অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
অভিযোগ অনুযায়ী, ট্রাকটি থামানো থেকে শুরু করে ইয়াবা সরিয়ে নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় সাতকানিয়া থানার কনস্টেবল ফয়েজ আহম্মদ, গাজী মো. মহসিন, উপপরিদর্শক (এসআই) এসএম মাহবুবুল ইসলাম এবং পুলিশের কথিত সোর্স রবিন ও মোমেনের সম্পৃক্ততা ছিল। তবে কনস্টেবল ফয়েজ ও মহসিন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এসআই মাহবুবুল ইসলামের দাবি, সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে ট্রাকটি থামানো হলেও আগে তল্লাশি করা হয়েছে জানতে পেরে তিনি আর তল্লাশি চালাননি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৪ অক্টোবর দুপুরে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ইসলামনগর এলাকায় নীল রঙের একটি মিনিট্রাক সড়কের পাশে রেখে হোটেলে খাবার খাচ্ছিলেন চালক নাছির। ট্রাকটির নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ড-১২-৭৫৩৮। এ সময় সেখানে পুলিশের কথিত সোর্স রবিন ও মোমেনের সঙ্গে তার দেখা হয়।
পরে নাছির মাতামুহুরী নদীর সেতুসংলগ্ন একটি পাম্প স্টেশন থেকে জ্বালানি নিয়ে বান্দরবানের লামার উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে পৌঁছে অন্য এক মাদক বহনকারীর কাছ থেকে ৩০ হাজার ইয়াবা সংগ্রহ করেন বলে জানা গেছে। এরপর ট্রাকের চালকের আসনের নিচে বিশেষভাবে তৈরি জায়গায় ইয়াবাগুলো লুকিয়ে রাখেন তিনি। পরে খালি ট্রাক নিয়ে লোহাগাড়া উপজেলার পুটিবিলা সড়ক হয়ে ফকিরহাট এলাকায় সবজি বোঝাই করতে যাচ্ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, গন্তব্যে পৌঁছানোর কিছু দূর আগে থেকেই একটি লাল রঙের মোটরসাইকেল ও একটি নোহা গাড়ি নিয়ে রবিন, মোমেন এবং কনস্টেবল ফয়েজ ও মহসিন ট্রাকটির পিছু নেন। একপর্যায়ে পুটিবিলা ইউনিয়নের এম চর হাটসংলগ্ন মাইরগ্গ্যারচর ফকিরহাট এলাকার নির্জন সড়কে মোটরসাইকেল দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ট্রাকটি থামানো হয়।
এরপর কনস্টেবল মহসিন ট্রাকের জানালা খুলে চালকের পাশের আসনে বসেন এবং নাছিরকে হাতকড়া পরান। পরে কনস্টেবল ফয়েজও ট্রাকে ওঠেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এ সময় ট্রাকটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন তারা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ট্রাকটি প্রথমে আমিরাবাদ ও ঠাকুরদীঘিসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘোরানো হয়। পরে সাতকানিয়া উপজেলার কেরানীহাট রেলক্রসিংসংলগ্ন একটি এলপিজি পাম্প স্টেশনে নেওয়া হয়। সেখানে চালককে ট্রাক থেকে নামিয়ে তল্লাশি করা হয়। এ সময় চালকের আসনের নিচে বিশেষভাবে লুকিয়ে রাখা ৩০ হাজার ইয়াবা নিজেদের হেফাজতে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় এসআই এসএম মাহবুবুল ইসলাম পুরো কার্যক্রম তদারকি করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার দিন রাতে তিনি লোহাগাড়া এলাকায় অবস্থান করছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তার সঙ্গে থানার কম্পিউটার অপারেটর ও কনস্টেবল প্রীতম সাহাও ছিলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরে এসআই মাহবুব একটি মোটরসাইকেল নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সেখানে উপস্থিত অন্যরা ট্রাকের চাবি ও চালককে তার জিম্মায় দিয়ে দ্রুত সরে যান। এরপর এসআই মাহবুব চালক নাছিরকে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ট্রাক আটকে রাখার বিষয়টি থানায় জানিয়ে আরও দুই পুলিশ সদস্যকে ঘটনাস্থলে নিয়ে আসেন এসআই মাহবুব। তবে ট্রাকটিতে এরই মধ্যে তল্লাশি চালানো হয়েছে জানতে পেরে ওই দুই পুলিশ সদস্য সেখান থেকে চলে যান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে ট্রাকে ইয়াবা পাওয়া যায়নি—এমন বক্তব্যের একটি ভিডিও ধারণ করে চালক নাছির ও ট্রাকটি ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এরপর নাছির ট্রাক নিয়ে চট্টগ্রাম নগরীর উদ্দেশে রওনা হন।
এ ঘটনায় দুটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিবেদক। ওই ফুটেজে কনস্টেবল ফয়েজ আহম্মদকে ট্রাকের সামনে এবং গাজী মো. মহসিনকে চালকের পাশের আসনে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। তাদের দুজনের মুখেই মাস্ক ছিল। তবে থানার একাধিক উপপরিদর্শক, সহকারী উপপরিদর্শক ও কনস্টেবল তাদের শনাক্ত করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
থানা সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি পুলিশের নজরে আসার পর অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ট্রাকচালক নাছির বলেন, লামা থেকে লোহাগাড়া আসার পথে মাইরগ্গ্যারচর ফকিরহাট এলাকায় পৌঁছালে রবিন ও কনস্টেবল ফয়েজ মোটরসাইকেল দিয়ে তার ট্রাকের গতিরোধ করেন। এরপর এক পুলিশ সদস্য ট্রাকের সামনের আসনে উঠে তার এক হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর কনস্টেবল ফয়েজও ট্রাকে ওঠেন। এ সময় ট্রাকে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার তার ছিঁড়ে ফেলা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাছিরের ভাষ্য, পরে তাকে লোহাগাড়া ট্রাফিক পুলিশ বক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের সাইড না দেওয়ার অভিযোগ তুলে ট্রাফিক আইনে মামলা দেওয়ার কথা বলা হয়। পরে ফোনে কথা বলে তাঁকে সাতকানিয়ার ঠাকুরদীঘি পেট্রোল পাম্প এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রবিন ও মোমেনের মোটরসাইকেলের সঙ্গে আরও একটি মোটরসাইকেলে তিন যুবক যোগ দেন।
তিনি বলেন, একপর্যায়ে তাকে কেরানীহাট রেলক্রসিংয়ের পর একটি এলপিজি পাম্পের নির্জন স্থানে নেওয়া হয়। সেখানে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় একজন পুলিশ সদস্য আসেন। তাঁকে ট্রাক থেকে নামিয়ে ওই অটোরিকশায় তোলা হয়। তার এক হাত অটোরিকশার লোহার অংশের সঙ্গে হাতকড়া দিয়ে আটকানো হয়। পরে ওই পুলিশ সদস্য তাকে নিয়ে কিছুটা সামনে অবস্থান নেন।
নাছিরের অভিযোগ, এ সময় ফয়েজ, রবিন, মোমেনসহ অন্য পুলিশ সদস্য ও তাদের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা ট্রাকে তল্লাশির নামে জিনিসপত্র এলোমেলো করেন। পরে চালকের আসনের নিচে রাখা ৩০ হাজার ইয়াবা নিয়ে যান। তিনটি বড় পোটলায় ১০ হাজার করে ইয়াবা রাখা ছিল। পরে ট্রাকের সিসিটিভি ক্যামেরার মেমোরি কার্ডও ফরম্যাট করে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
নাছির আরও বলেন, ইয়াবা নিয়ে একটি দল চলে যাওয়ার পর অন্য কয়েকজন তাকে ঘুরিয়ে সি ওয়ার্ল্ড রেস্টুরেন্টের সামনে নিয়ে যান। পরে ওবাইদিয়া মাদ্রাসা গেটসংলগ্ন সড়ক বিভাগের একটি পরিত্যক্ত ভবনের সামনে নেওয়া হয় তাকে। সেখানে দুই পুলিশ সদস্য ট্রাকের চাবি এসআই মাহবুবের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে চলে যান।
চালকের ভাষ্য, এরপর এসআই মাহবুব ও এক কনস্টেবল ট্রাকে ইয়াবা আছে বলে অভিযোগ তুলে তাকে মারধর করেন এবং জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। এর আগে অন্য একটি দল ট্রাক থেকে ইয়াবা নিয়ে গেছে—গ্রেফতারের ভয়ে তিনি সে কথা তাদের জানাননি। পরে ঘটনাস্থলে আসা আরও দুই পুলিশ সদস্যকে কয়েক ঘণ্টা ধরে ট্রাকটি বিভিন্ন স্থানে ঘোরানো ও তল্লাশি করার কথা জানান তিনি। এ কথা শোনার পর ওই দুই পুলিশ সদস্য আর তল্লাশি করতে রাজি হননি।
নাছিরের দাবি, পরে এসআই মাহবুব ট্রাকটি তল্লাশি করা হয়নি—এমন বক্তব্যের একটি ভিডিও ধারণ করে তাঁকে ছেড়ে দেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কনস্টেবল ফয়েজ আহম্মদ বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও লাভ হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, ঘটনার দিন রাতে তিনি থানায় ছিলেন। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
অন্য কনস্টেবল গাজী মো. মহসিন বলেন, তিনি সেখানে ছিলেন না। তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন।
থানার কম্পিউটার অপারেটর ও কনস্টেবল প্রীতম সাহা বলেন, ঘটনার দিন রাতে এসআই মাহবুবের দাঁতের চিকিৎসক দেখানোর জন্য তার সঙ্গে লোহাগাড়া গিয়েছিলেন। সেখানে চিকিৎসককে না পেয়ে তাঁরা ফিরে আসেন। পরে ঠাকুরদীঘি হয়ে কেরানীহাটে যান। এ সময় মাহবুবকে ফোনে সোর্সের সঙ্গে কথা বলতে শুনেছেন বলে জানান তিনি।
প্রীতম সাহা আরও বলেন, এর অনেকক্ষণ পর ট্রাকটি আটকানো হয়। সাধারণত তিনি বাইরে দায়িত্ব পালন করেন না। তবেওই দিন এসআই মাহবুব তাকে ডেকে নিয়েছিলেন।
পুলিশের কথিত সোর্স রবিনের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। অপর সোর্স মোমেনের ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
সাতকানিয়া থানার উপপরিদর্শক এসএম মাহবুবুল ইসলাম বলেন, সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে তারা একটি ট্রাক থামিয়েছিলেন। পরে ট্রাকচালক আগে তল্লাশি করা হয়েছে বলে জানালে তিনি সোর্সকে বকাঝকা করেন। এরপর ট্রাকটিতে আর তল্লাশি না চালিয়ে চালকের ভিডিও ধারণ করে তাকে ছেড়ে দেন।
কনস্টেবল ফয়েজ আহম্মদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই মাহবুব বলেন, প্রায় এক বছর আগে তার সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ওই সময় ব্যস্ত থাকায় ফয়েজকে দিয়ে সন্তানকে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন। ফয়েজ তার সন্তানের অনেক সেবা-যত্ন করেছিলেন। সেই থেকেই তার সঙ্গে ফয়েজের সুসম্পর্ক তৈরি হয়।
সোর্স রবিনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে এসআই মাহবুব বলেন, রবিনের বাবা মাছ ব্যবসায়ী বাবুলকে একবার রাজনৈতিক মামলায় আটক করা হয়েছিল। ওই সময় রবিন থানায় এসেছিলেন। সেখানেই তার সঙ্গে রবিনের পরিচয় হয়। পরে মাদক পাচারসংক্রান্ত কোনো তথ্য জানা থাকলে তাকে জানাতে বলেছিলেন।
সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবদুল আলীম বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে আসার পর তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
সময়ের আলো/জোই