ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ৯ মার্চ ২০২১ ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ৯ মার্চ ২০২১

বাংলা ভাষাপ্রেমী বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন
তাপস হালদার
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 386

ভাষা চিন্তা-চেতনা মনন ও অন্তরের ভাব প্রকাশের কেবল বাহনই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশ ও জাতির আত্মপরিচয়। হাজার বছর ধরে বাংলা ভাষা প্রকাশ করে যাচ্ছে বাঙালি জাতির অস্তিত্ব ও স্বকীয়তা। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যে কোনো মিল না থাকার পরও শুধু ধর্মের দোহাই দিয়ে বারশো মাইল ব্যবধানের দুটি পৃথক ভ‚খÐকে এক করে পাকিস্তান নামক একটি উদ্ভট রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। সমগ্র পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। অন্যদিকে শুধু ৭.২ শতাংশ মানুষ কথা বলত উর্দুতে। সেই উর্দুকেই পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রভাষা করার জন্য জোর পাঁয়তারা শুরু করল।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান জন্মের পরপরই কলকাতার সিরাজউদৌল্লা হোটেলে পূর্ব পাকিস্তানে একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগঠন করার সিদ্ধান্ত হয়। সে প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। তারই ফলে ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তানের কর্মী সম্মেলনে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠিত হয়। সে সম্মেলনে যেসব প্রস্তাব গৃহীত হয় তার মধ্যে অন্যতম ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি। সেখানে বলা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের লেখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা বাংলা করা হোক। গৃহীত প্রস্তাবনা পাঠ করেন সেদিনের ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান।বঙ্গবন্ধু কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে সরাসরি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে শরিক হয়ে যান। ভাষা আন্দোলনের শুরুতে তমুদ্দিন মজলিসের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হন। ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ যখন ভাষা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণস্বাক্ষর অভিযান শুরু করেন তখন থেকেই তিনি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ৪৭ সালে ডিসেম্বর মাসে ১৪ জন ভাষা বীর সর্বপ্রথম ২১ দফা দাবি নিয়ে একটি ইশতেহার প্রণয়ন করেছিলেন। ইশতেহারের দ্বিতীয় দাবিটি ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংক্রান্ত। এই ইশতেহার প্রণয়নে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ছিল অসামান্য, তিনি ছিলেন অন্যতম স্বাক্ষরদাতা। ১৫০নং মোগলটুলীর ‘ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’ ছিল সে সময়ের প্রগতিশীল ছাত্র-যুব ও রাজনৈতিক কর্মীদের মিলনকেন্দ্র। ভাষা আন্দোলনের সপক্ষের কর্মীরা নিয়মিত এখানে মিলিত হতেন এবং বিভিন্ন কর্মপন্থা নির্ধারণ করতেন। শেখ মুজিব, শওকত আলী, কামরুদ্দিন আহমেদ প্রমুখ নেতারা ছিলেন এই ক্যাম্পের প্রাণশক্তি। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ফজলুল হক মুসলিম হলের তমুদ্দিন মজলিস ও মুসলিম ছাত্রলীগের যৌথসভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, আবুল কাশেম, রণেশ দাশগুপ্ত, অজিত গুহসহ অন্য নেতারা। সভায় রাষ্ট্রভাষার দাবিতে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিস ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র হলগুলোর ছাত্র সংসদ থেকে দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়।
১ মার্চ প্রচারমাধ্যমে একটি বিবৃতি দেওয়া হয় যে, ১১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে ভাষার দাবিতে হরতাল হবে। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন অধ্যাপক আবুল কাশেম (তমুদ্দিন মজলিস সম্পাদক), শেখ মুজিবুর রহমান (পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্য), নঈম উদ্দিন আহমেদ (পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহŸায়ক) এবং আব্দুর রহমান চৌধুরী (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যুব সম্মেলনে পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের নেতা)। জাতীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এই বিবৃতির গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য অবিস্মরণীয় দিন। এই দিন ভাষার দাবিতে প্রথম হরতাল পালিত হয়। এটাই হলো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম হরতাল। হরতালের নেতৃত্ব দেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি পুলিশি নির্যাতনেরর শিকার হন এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম গ্রেফতার হন। ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বটতলায় ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য ছাত্র সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদ ভবন (বর্তমান জগন্নাথ হল) অভিমুখে মিছিল বের হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সদ্য কারামুক্ত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষা আন্দোলন আস্তে আস্তে গণআন্দোলনে রূপ নিতে থাকে, শহর থেকে আন্দোলন সারা পূর্ব পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে আন্দোলনে ছাত্র-যুবকদের সম্পৃক্ত করতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। সে জন্যই ১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে তাঁকে আটক করে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রæয়ারি পর্যন্ত একটানা কারাগারে আটক করে রাখা হয়, সঙ্গত কারণেই ২১ ফেব্রæয়ারির রাজপথের মিছিলে সশরীরে হাজির হওয়ার সুযোগ ছিল না।
ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে ছোট করার জন্য এতদিন প্রচার করা হতো তিনি ২১ তারিখের মিছিলে ছিলেন না। অথচ তাঁকে যে ভাষা আন্দোলনের জন্যই দুই বছরের বেশি সময় ধরে আটক করে রাখা হয়েছিল সে বিষয়টি সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হতো। জেলে বসেও তিনি সার্বক্ষণিক নেতাদেরকে চিরক‚ট লিখে পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনা দিতেন। ১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রæয়ারির প্রথম বার্ষিকীতে মিছিল ও আরমানিটোলার সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে তিনি বলেছিলেন, একুশে ফেব্রæয়ারিকে শহীদ দিবস ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জোর দাবি জানান। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা দায়িত্ব পালনকালে বাংলা ভাষার উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখেন। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রর ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাংলা ভাষায় সংবিধান প্রণীত করেন। এটিই একমাত্র সংবিধান যা বাংলা ভাষায় প্রণীত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রথম বাংলায় বক্তব্য দিয়ে বিশ^সভায় বাংলাকে
তুলে ধরেন।
বাংলা ভাষা আজ দেশের গÐি পেরিয়ে সারাবিশে^ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অফিসের কাজে বাংলা ভাষা প্রচলনের প্রথম সরকারি নির্দেশনা জারি করেন। আদেশে বলা হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা তবু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি স্বাধীনতার তিন বছর পরও সরকারি কাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাতৃভাষার প্রচলন হয়নি।
মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা নেই দেশের প্রতি তার ভালোবাসা থাকবে বিশ^াস করতে কষ্ট হচ্ছে। তিনি হৃদয় দিয়ে যেমন ভালোবাসতেন এই বাংলাদেশকে তেমনই ভালোবাসতেন বাংলা ভাষাকে। যতদিন বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ থাকবে ততদিনই বাঙালির হৃদয় জুড়ে থাকবেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা ও
নিরন্তর ভালোবাসা।

সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ
    সাবেক ছাত্রনেতা


 




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]