বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী : রোমহর্ষক ইতিহাসের ‘রাজসাক্ষী’র বিদায়

প্রভা নাওয়ার

ফিচার

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অনেক বেশি ব্যক্তিগত, নীরব এবং বেদনাদায়ক ইতিহাস হচ্ছে বীরাঙ্গনাদের জীবন। টেপরী রাণী সেই ইতিহাসেরই এক নাম— যিনি

2026-05-14T16:35:32+00:00
2026-05-14T17:18:32+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
ফিচার
বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী : রোমহর্ষক ইতিহাসের ‘রাজসাক্ষী’র বিদায়
প্রভা নাওয়ার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ৪:৩৫ পিএম  আপডেট: ১৪.০৫.২০২৬ ৫:১৮ পিএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অনেক বেশি ব্যক্তিগত, নীরব এবং বেদনাদায়ক ইতিহাস হচ্ছে বীরাঙ্গনাদের জীবন। টেপরী রাণী সেই ইতিহাসেরই এক নাম— যিনি যুদ্ধের সময়ের সহিংসতা, যুদ্ধ-পরবর্তী সামাজিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘ নীরব সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছেন। তাঁর জীবন কেবল একটি ব্যক্তিগত গল্প নয়— এটি পুরো একটি সময়ের সামাজিক মানসিকতা, ভাঙন এবং মানবিকতার পরীক্ষার দলিল।

যুদ্ধের সময় : এক কিশোরীর আতঙ্কে বেড়ে ওঠা বাস্তবতা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় টেপরী রাণী ছিলেন ১৭ বছরের কিশোরী। সেই সময় সারা দেশের মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিল, নারীদের নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি ছিলো আরও বেশি।

যুদ্ধকালীন সেই অস্থির পরিস্থিতিতে বহু পরিবারই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটায়। টেপরী রাণীর পরিবারও সেই সময়ের বাস্তবতার বাইরে ছিল না। যুদ্ধের সময় চারপাশের ভয়াবহ পরিস্থিতি তাদের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

পরিবারের জন্য নিজেকে বিসর্জন
যুদ্ধ চলছে। এমন সময় একদিন এক রাজাকার এসে টেপরী রাণীর বাবাকে বললো- ‘তোমার মেয়েকে যদি পাকিস্তানি ক্যাম্পে দাও, তাহলে পুরো পরিবার বেঁচে যাবে।’ 

পরিবারকে রক্ষা করতে এ প্রস্তাবে রাজি হলো তার অসহায় বাবা। টেপরী জানত ক্যাম্পে গেলে কী হবে তার সঙ্গে, তবু পরিবারের কথা ভেবে সে বাবার সম্মতির বিরোধিতা করলো না। তার বাবাই তাকে হাত ধরে পৌঁছে দিলো ক্যাম্পে। ক্যাম্পে যাওয়ার পথে বাবা-মেয়ে কোনও কথা বলেনি। দুজনই দুজনের অসহায়ত্ব বুঝতে পেরে নীরব থেকেছিলো হয়ত। পাকসেনারা টেপরীকে ধর্ষণ করবে, ধর্ষণের পর মেরেও ফেলতে পারে- এই বাস্তবতা মেনে নিয়েছিলো দুজনই। সেই কঠিন দুঃসময়ে বাবা ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো কী না, এ নিয়ে বাবার প্রতি তার কোনও রাগ-অভিমান আছে কী না, পরবর্তীতে তা আর জানা যায়নি। 


ক্যাম্প থেকে ফিরে আসা : এক যুদ্ধের পর আরেক যুদ্ধের শুরু
মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও অনেক মানুষের জীবনে যুদ্ধ শেষ হয়নি। বিশেষ করে বীরাঙ্গনাদের ক্ষেত্রে যুদ্ধ-পরবর্তী সময় ছিল আরও কঠিন। টেপরী রাণীর জীবনও সেই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই গেছে।

যুদ্ধ শেষে তিনি যখন সমাজে ফিরে আসেন, তখন তিনি শুধু একজন মানুষ নন— হয়ে ওঠেন সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির শিকার। এই সময়টা ছিল দ্বৈত যুদ্ধের মতো— একটি যুদ্ধ শেষ হয়েছে অস্ত্র দিয়ে, আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়েছে সমাজের চোখে, কথায় এবং অবজ্ঞায়।

দীর্ঘ ছয় মাসে এমন কোনও রাত যায়নি, পাকসেনারা তাকে ধর্ষণ করেনি। এতে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন টেপরী। সেই অবস্থায় বাড়িতে ফিরে এলে- শুরু হয় আরেক যন্ত্রণা। অনাগত সন্তানকে গ্রহণ করতে নারাজ সমাজ। সন্তানকে ‘নষ্ট’ করে ফেলতে বলে সবাই। তখন টেপরীর বাবা তাকে অভয় দিয়ে বলেন-’সন্তানটা নষ্ট করিস না। তোকে তো সমাজ গ্রহণ করবে না। শেষ বয়সে এ সন্তানই হবে তোর বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল।’

সন্তান ও পরিচয়ের সংগ্রাম
বাবার কথা সত্যি হয়েছিল। ছেলে সুধীর বর্মনের আশ্রয়েই কেটেছে তার বাকি জীবন। কিন্তু সুধীর বর্মনের পরিচয় ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার কথা বিভিন্ন সময় উঠে এসেছে। যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজে ‘পরিচয়’ একটি বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছিল অনেকের জন্য, যেখানে মানুষকে তার অতীত দিয়ে বিচার করা হতো, বেঁচে থাকার সংগ্রাম দিয়ে নয়। এটি ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের একটি সামাজিক সমস্যা।

সমাজের কটূক্তি সুধীরের পিছু ছাড়েনি। সুধীরকে ‘পাঞ্জাবির বাচ্চা’ বলে অপমান করা হয় প্রতিনিয়ত। একবার তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সে প্রতিবাদ করে না কেন? উত্তরে সে বলেছিলো, ‘ঝগড়া করতে তো লোক লাগে, আমার কে আছে?’


উত্তরাধিকার : আশার আলো
সুধীরের পাশে সত্যিই এ সমাজের কেউ নেই। এরপরও সুধীর মাথা উঁচু করে বেঁচে আছে। তার একটি মেয়ে আছে। ভালোবেসে মেয়ের নাম রেখেছে ‘জনতা’। জনতা একবার তার দাদি টেপরী রাণীর প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলো, ‘দেশে যদি আবার যুদ্ধ হয়, দাদির মতো আমিও দেশের জন্য নিজের সব কিছু বিসর্জন দিতে দ্বিতীয়বার ভাববো না।’

এই দৃঢ়তা থেকেই বোঝা যায়- জনতা শুধু টেপরী রাণী বা সুধীরের নয়, তিনি একাত্তরের একজন উত্তরসূরি!

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি : অনেক দেরিতে পাওয়া সম্মান
দীর্ঘ সময় অবহেলা ও নীরবতার পর বাংলাদেশ সরকার অনেক বীরাঙ্গনাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ২০১৭ সালে টেপরী রাণীও সেই স্বীকৃতির অন্তর্ভুক্ত হন। 

এই স্বীকৃতি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়— এটি ছিল ইতিহাসের একটি ভুল স্বীকার করার চেষ্টা। কারণ যুদ্ধের বিজয়ের গল্পের আড়ালে যে নারীরা নীরবে কষ্ট সহ্য করেছেন, তাদের অবদান বহু বছর ধরে আড়ালে ছিল। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি সেই নীরব ইতিহাসকে দৃশ্যমান করার একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

টেপরী রাণীর মৃত্যু : এক ইতিহাসের বিদায়
টেপরী রানীকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার সময় জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কী চান তিনি? বৃদ্ধ টেপরী বলেছিলেন, মৃত্যুর পর তাঁর দেহটাকে লাল-সবুজের পতাকায় মুড়িয়ে জাতি বিদায় জানাবে- এর চেয়ে বেশি কিছু তার চাওয়ার নেই। তার সেই চাওয়া পূরণ হয়েছে।

১৩ মে ২০২৬, বার্ধক্যজনিত কারণে ৭১ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেছেন টেপরী রাণী। ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানিয়ে সমাহিত করা হয়েছে। তিনি লাল সবুজের পতাকা বুকে নিয়েই পৃথিবী থেকে, তাঁর অনেক ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া প্রিয় বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিয়েছেন।

টেপরী রাণীর জীবন : এক ব্যক্তির নয়, এক সময়ের প্রতিচ্ছবি
টেপরী রাণীর গল্পকে শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়— যুদ্ধ শুধু সীমান্তে হয় না, মানুষের ঘরেও হয়। বিজয়ের পরও অনেক মানুষের জীবনে যুদ্ধ শেষ হয় না, বরং নতুন সংগ্রাম শুরু হয়। সমাজের গ্রহণযোগ্যতা কখনও কখনও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির চেয়েও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তিনি সেই অগণিত নারীর একজন, যাদের নাম ইতিহাসে সীমিতভাবে এসেছে, কিন্তু যাদের জীবন যুদ্ধের ইতিহাসকে পূর্ণতা দিয়েছে।

শেষ কথা : ইতিহাসের নীরব কণ্ঠস্বর
টেপরী রাণীর জীবন আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে যায়— আমরা ইতিহাসকে কীভাবে দেখি? শুধু বিজয় দিয়ে, নাকি সেই বিজয়ের পেছনের অগণিত নীরব কান্না দিয়েও?

তিনি কোনও দূর ইতিহাসের চরিত্র নন। তিনি ছিলেন বাস্তব একজন মানুষ— যাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতার মূল্য শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি মানবিকও।

/মহু



  বিষয়:   বীরাঙ্গনা  টেপরী রাণী  ইতিহাস  ১৯৭১ 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: