‘গোস্ট’ শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে ভৌতিক কোনোকিছুর কথা মনে হতে পারে। কিন্তু সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘গোস্টিং’ আলাদা ব্যাপার। সম্পর্কে থাকা একজন মানুষ যখন হঠাৎ করেই কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন, অনেকটা ভূতের মতো উধাও হয়ে যান, তখন সেটিকে বলা হয় ‘গোস্টিং’।
রোমান্টিক সম্পর্কের পাশাপাশি বন্ধুত্ব কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাধারণ যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গোস্টিং হতে পারে।
ধরুন, আপনি কারও সঙ্গে সম্পর্কে রয়েছেন কিংবা কয়েক মাস ধরে তার সঙ্গে নিয়মিত ডেট করছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একসঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, ব্যক্তিগত ছবি ও রোমান্টিক বার্তা আদান-প্রদান করেছেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন ওই ব্যক্তি আপনার বার্তার উত্তর দেওয়া বন্ধ করে দিলেন। ফোন ধরছেন না, কোনো বার্তারও জবাব দিচ্ছেন না, এমনকি সব ধরনের যোগাযোগও বন্ধ করে দিয়েছেন, অথচ এর কোনো ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। এমন পরিস্থিতিই মূলত গোস্টিং।
সম্পর্কের ক্ষেত্রে গোস্টিংয়ের পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। বন্ধুত্ব হোক কিংবা প্রেম, কোনো সম্পর্কই সবসময় একই রকম থাকে না। একটা সময় কোনো সম্পর্ককে কারও কাছে বিরক্তিকর বা বোঝা মনে হতে পারে। হয়ত একসময় মানুষটিকে ভালো লেগেছিল বলেই কথা বলা বা মেলামেশা হয়েছে, কিন্তু পরে সেই আগ্রহ আর আগের মতো থাকেনি। তখন সম্পর্কটি কেন আর রাখতে চাইছেন না, তা নিয়ে সরাসরি কথা বলা বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়াকে অনেকের কাছে কঠিন মনে হতে পারে। ফলে, মুখোমুখি আলোচনা এড়িয়ে হঠাৎ দূরে সরে যাওয়ার পথ বেছে নেন কেউ কেউ।
সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সহজ কৌশল মনে হলেও গোস্টিংয়ের প্রভাব দুপক্ষের ওপর একরকম হয় না। যিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন, তিনি হয়ত সম্পর্কের বোঝা থেকে মুক্তি পেয়েছেন বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু যিনি কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই যোগাযোগ হারান, তার জন্য বিষয়টি মানসিকভাবে বেশ কষ্টদায়ক হতে পারে। অনেক সময় হীনমন্যতা তৈরি হয়, নিজেকে দোষী মনে হতে থাকে। মনে প্রশ্ন জাগে, ‘আমার কী দোষ ছিল?’, ‘আমার সঙ্গে এমন করা হলো কেন?’ কিংবা ‘কিছু না জানিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো কেন?’
আধুনিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইল ফোনের কারণে গোস্টিংয়ের সুযোগ বেড়েছে। ফোন নম্বর ব্লক করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া কিংবা বার্তার উত্তর না দেওয়ার মাধ্যমেই সহজে কারও কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া সম্ভব। এতে অপর পক্ষের অনুভূতিকে উপেক্ষা করাও সহজ হয়ে যায়।
আপনি যদি মনে করেন সম্পর্কে গোস্টিংয়ের শিকার হয়েছেন, তাহলে প্রথমেই কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে পারেন। কাউকে ফোন বা বার্তা দেওয়ার পর তিনি সাড়া দেন কি না, তা দেখার জন্য পাঁচ থেকে সাত দিন অপেক্ষা করা যেতে পারে। এই সময়ের মধ্যে ওই ব্যক্তি কোনো জরুরি বিষয় বা কারণ আপনাকে জানাতে পারেন। তবে এক সপ্তাহের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও যদি কোনো সাড়া না আসে, তাহলে ধরে নেওয়া যেতে পারে যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই যোগাযোগ বন্ধ করেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে কী ঘটেছে, কেন এমন হলো- এসব ভেবে বারবার নিজেকে প্রশ্ন করা স্বাভাবিক। আগের কথোপকথন কিংবা দুজনের মধ্যকার কোনো সমস্যার কথা বারবার মনে পড়তে পারে। তবে, বিষয়টি নিজের ওপর চাপিয়ে না নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা জরুরি। সম্পর্কের একটি খারাপ অভিজ্ঞতা যেন নিজের আত্মবিশ্বাস নষ্ট না করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, ভবিষ্যতে এমন মানুষও আসতে পারেন, যিনি আপনাকে আপনার মতো করেই গ্রহণ করবে।
চাইলে সম্পর্কের সমাপ্তি টানতে একটি শেষ বার্তাও পাঠানো যেতে পারে। তবে সেই বার্তায় রাগ, অভিযোগ কিংবা কষ্টের প্রকাশ না করে শান্ত ও বিনয়ী থাকা শ্রেয়।
জীবনের যেকোনো তিক্ত অভিজ্ঞতার মতো গোস্টিংও কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সেই অভিজ্ঞতা আঁকড়ে থাকলে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সম্পর্কের এই অধ্যায় শেষ হয়ে গেলে নিজেকে সামলে নিয়ে নিজের মতো করে এগিয়ে যাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। যে চলে যাওয়ার, সে হয়ত চলেই যাবে, কিন্তু নিজের পথচলা থামিয়ে রাখার কোনো কারণ নেই।
সময়ের আলো/মহু