সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। ব্যস্ততার তুঙ্গে রয়েছে দেশের মালাকার বা প্রতিমাকারকরা। দিনরাত এক করে চলছে মাটি, খড় ও রঙের নিপুণ ছোঁয়ায় প্রতিমা তৈরির কাজ। তারপর তা পূজার হাটে বেচাকেনা হচ্ছে।
সরেজমিনে জেলারকাঁঠালবাড়ী কুমারপাড়া, রাজারহাটের বৈদ্যের বাজারের মালাকার পরিবারগুলোতে এমন চিত্রই দেখা গেছে। পরিবারের নারী, পুরুষ থেকে শুরু করে তরুণ সদস্যরাও হাত লাগিয়েছেন এই শিল্পকর্মে। খড় দিয়ে অবয়ব তৈরি, মাটির প্রলেপ দেওয়া কিংবা শুকানোর পর নিখুঁত রূপ দান- সব মিলিয়ে দম ফেলার ফুরসত নেই কারও। কারিগরদের হাতের জাদুতে যেন প্রাণ ফিরে পাচ্ছে এক একটি প্রতিমা।
শরৎকাল এলেই প্রতিমা প্রস্তুতকারকদের কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বাপ-দাদার আমল থেকেই তারা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। সারাবছর টুকটাক কাজ থাকলেও এই সময়ের জন্য তাদের পুরো বছর অপেক্ষা করতে হয়। বিভিন্ন পূজা কমিটি ও মন্দির থেকে প্রতিদিন আসছে তাগিদ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা পৌঁছে দিতে হবে। তাই দিনরাতের হিসেব মিলিয়ে কাজ করছেন কারিগররা। কাকডাকা ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কারখানায় এখন একটানা কাজ চলছে।
সরেজমিনে জেলার কয়েকটি মণ্ডপে গিয়ে দেখা যায়, বাঁশ ও কাঠের কাঠামোর উপর ভর দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরি করে তাতে কাদামাটির প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে। শুকিয়ে যাওয়ার পর মাটির উপর কারুকাজ করা হচ্ছে। কোথাও দুর্গা সরস্বতী ও গণেশের অবয়ব তৈরির কাজ চলছে। আবার কোথাও নিখুঁতভাবে প্রতিমার চোখ, মুখমণ্ডল, পোশাক ও বিভিন্ন অলংকারের নকশা ফুটিয়ে তুলতে অবিরাম শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন কারিগররা। শিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় প্রতিমা তৈরির কাজ শেষের দিকে। প্রতিমাগুলো অলংকার ও সাজসজ্জায় সজ্জিত করে নেওয়া হবে মণ্ডপে।
প্রতিমা শিল্পীরা জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার প্রতিমার চাহিদা ও দাম কিছুটা ভালো, তবে প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহৃত বাঁশ, কাঠ, খড়, মাটি, রঙসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে । একইসঙ্গে বেড়েছে কারিগর ও শ্রমিকদের মজুরি। ফলে, প্রতিমার দাম বাড়লেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রত্যাশিত লাভ করতে পারছেন না প্রতিমা শিল্পীরা।
রাজারহাট বৈদ্যের বাজার এলাকার প্রতিমা কারিগর অশোক, দেবনাথ ও শংকর পাল জানান, প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয় কয়েক মাস আগে থেকেই। প্রথমে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে কাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর খড় দিয়ে প্রতিমার অবয়ব তৈরি করে কয়েক ধাপে মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়। মাটি শুকানোর পর রং ও সাজসজ্জার কাজ শেষ করে প্রতিমা মণ্ডপে পাঠানো হয়। দুর্গাপুজার সময় ঘনিয়ে আসায় এখন কাজের চাপ অনেক বেড়েছে।
তারা আরও জানান, একটি প্রতিমা তৈরিতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগে। প্রতিমার আকার, নকশা ও কারুকাজের উপর নির্ভর করে এর মূল্য নির্ধারণ করা হয়। বড় ও বিশেষ নশকায় প্রতিমা তৈরিতে সময় ও শ্রম বেশি লাগে। ফলে, এসব প্রতিমার দামও তুলনামূলকভাবে বেশি হয়ে থাকে।
এদিকে, শান্তিপূর্ণ ও উৎসব মুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে জেলা প্রশাসন ও পূজা উদযাপন কমিটি। কুড়িগ্রাম জেলায় এবার ৫২২টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি রবি বোস বলেন, ‘জেলা প্রশাসন আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন, সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মণ্ডপগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং কয়েক স্তরে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হবে। আমরা নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপন করার আশাবাদী। নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের কোনো উদ্বেগ নেই। জেলা প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।’
পূজা উদযাপন কমিটি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি মন্ডপকে নিরাপত্তার আওতায় আনার পাশাপাশি মণ্ডপের আশপাশের পরিবেশ, বিদ্যুৎ সংযোগ, অগ্নি নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পূজা চলাকালে দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্নে চলাচল ও উৎসবের পরিবেশ বজায় রাখতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপুজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে আগামী ১৮ অক্টোবর মহা যষ্টির মধ্য দিয়ে। ৫ দিনব্যাপী এই উৎসব ২২শে অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে। উৎসবকে ঘিরে এরই মধ্যে জেলার বিভিন্ন পূজা মণ্ডপে সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
প্রতিমা শিল্পীদের ব্যস্ততা ও পূজা উদযাপন কমিটির প্রস্তুতিতে কুড়িগ্রামে এখন শারদীয় দুর্গোৎসবের আবহ তৈরি হতে শুরু করেছে।
সময়ের আলো/মহু